Featured post

DEBRAJ SAHA TITLE SONG

A special song has been dedicated to Debraj Saha on the occasion of his 24th birth anniversary by MusicFul Hub. The entire vide...

Showing posts with label গল্প. Show all posts
Showing posts with label গল্প. Show all posts

রাত্রি ৩:১৫ : বসুভবনের অভিশাপ

 

রাত ৩টা ১৫। সমস্ত পৃথিবী ঘুমিয়ে থাকলেও কিছু ঘর জেগে থাকে।
বসুভবন ছিল ঠিক তেমন এক ঘর। বীরভূমের প্রত্যন্ত এক গ্ৰামের কাছে গভীর সবুজে ঢাকা, ঝোপজঙ্গলে ঘেরা এক ভূতুড়ে প্রাসাদ— বসুভবন। বছর ষাটেক আগেও লোকের আনাগোনা ছিল এখানে। জমিদার সূর্যকান্ত বসু ছিলেন তুখোড় শিকারি, সাহিত্যের ভক্ত, কিন্তু মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন। লোকমুখে শোনা যেত সূর্যকান্ত বসু অন্ধ ছিলেন। তবে তিনি সবসময় তাঁর হাতের কাছে একটি ছুড়ি এবং একটি ওয়াকিং স্টিক রাখতেন।

তার স্ত্রী মীনাক্ষী ছিলেন সুরের দেবী। কলকাতার নাট্যমঞ্চ থেকে সরাসরি এই গহীন গৃহে বন্দী হয়েছিলেন। কারণ একটাই—বিবাহ। আর তারপর যা ঘটেছিল, তা কারও জানা ছিল না পুরোপুরি, শুধু শোনা যেত এক নারীর গলা ফাটানো আর্তনাদ, এক শিশুর কান্না, আর ঘড়ির কাঁটা থেমে যাওয়া, যার সময় - রাত্রি ৩টা ১৫
বসুভবন ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হয়। ঝোপে ঢেকে যায় জানালা, দরজা। কিন্তু সেই ঘড়ির আওয়াজ আজও ভেসে আসে—যেদিন কেউ আসে… আর ফিরে যায় না।

২০২৫ সাল। দম্পতি অরিত্র ও অঙ্কিতা, ফটোগ্রাফি ও হন্টেড লোকেশনের উপর ডকুমেন্টারি বানানোর প্ল্যান করছিল। ইন্টারনেটে ‘India’s Most Haunted Places’ বলে একটা তালিকায় তারা দেখে “BasuVaban, Birbhum ”। অরিত্র খুব যুক্তিবাদী, নাস্তিক স্বভাবের মানুষ। ভূত-প্রেত মানে না।তবে ফটোগ্ৰাফির প্রতি তার আলাদা এক নেশা আছে বটে। বিশেষ করে ভুতুড়ে জায়গায় যেতে এবং সেখানে গিয়ে ফটোশুট করতে সে চরম ভালবাসত। যেটা অঙ্কিতা একদমই পছন্দ করতো না। কিন্তু অঙ্কিতার অনুভূতি তীক্ষ্ণ, চুপচাপ, দৃষ্টিতে কিছু চাপা ভয় লুকিয়ে থাকে। অরিত্র জোর করে রাজি করায়‌ অঙ্কিতাকে "ভয়কে ক্যামেরাবন্দি করতে হবে। ভয় থেকে পালিয়ে নয়, তাকে শুট করতে হয়।"
তারা এসে ওঠে বসুভবনের মূল ভবনে। আশপাশ ফাঁকা, সঙ্গী শুধু পুরনো জীর্ণ গাছের হাওয়া ও সেই কাঁপা কাঁপা ঘড়ির শব্দ—টিক… টিক… টিক…

রাত ৩টা। অঙ্কিতা ঘুমাতে পারছে না। হঠাৎ কানে আসে দূর থেকে এক নারীকণ্ঠ— "আমার গলা ফিরিয়ে দাও… আমি কাউকে ছাড়ব না, কাউকে না"। এই বলে একটি জোরাল হাসি, যার আওয়াজ হয়তো এই বাড়ির বাইরে পর্যন্ত পৌছায় না। অঙ্কিতা হঠাৎ উঠে বসে, কিন্তু অরিত্র তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। অঙ্কিতা ঘড়ির দিকে তাকায়—৩:১৫। ঘড়ির কাঁটা এক মুহূর্তে থেমে যায়।
টিক… টিক……চুপ।
আর তারপর...
একটা ভয়ংকর ছুরির টানার আওয়াজ, যেন মনে হচ্ছে কাউকে কুপিয়ে খুন করা হচ্ছে। তার সঙ্গে সঙ্গে বাতাস হিম হয়ে আসে। অঙ্কিতা বুঝতে পারে, কেউ যেন ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে তাকে দেখতে পাচ্ছে… কোনো নারীর সাদা শাড়ি, রক্তমাখা মুখ… কিন্তু চেহারাটা যেন মানুষের নয়, চোয়াল খুলে হাঁ করে হাসছে।
সে চিৎকার করতে চায়, কিন্তু তার গলা শুকিয়ে যায়।

পরদিন স্থানীয় পুরোহিত সোহম ভট্টাচার্য্য সঙ্গে দেখা করে অরিত্র। তিনিই জানান এই বসুভবন বাড়ির আসল রহস্য-
“সূর্যকান্ত তাঁর স্ত্রীর গানে সন্দেহ করত। বিশ্বাস করত, গান গেয়ে সে অন্য পুরুষদের ডাকে। শেষে এক রাতে, পেন্ডুলামের ঘড়ি ঠিক রাত্রি ৩টা ১৫ তে সে তার স্ত্রীর গলা কাটে সেই কণ্ঠস্বর থামানোর জন্য। কিন্তু শেষ নিঃশ্বাসে মীনাক্ষী অভিশাপ দেয়—
‘যে এই ঘরে গলায় আওয়াজ তুলবে, তার কণ্ঠ আমায় ফিরিয়ে দিতে হবে।'
তখন থেকেই, প্রতি রাতে কেউ না কেউ সেই ঘর থেকে নিখোঁজ হয়।”

সেদিন রাত্রেই অরিত্র ঠিক করে আজ কিছুই ভয় পাবে না। সে ক্যামেরা বসিয়ে দেয় আয়নার মুখোমুখি। আর অঙ্কিতাকে দিয়ে রেকর্ডিং করায় -- গানের মাধ্যমে। এভাবে চলতে চলতে ঘড়ির কাঁটা প্রথমে পৌছায় ২:৫৭… ৩:০৩… এবং তারপরই ৩:১৫। ঘড়ি থেমে যায়। অঙ্কিতার গানও হঠাৎ থেমে যায়। তার চোখ ছানাবড়া, সে আয়নার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠে। আয়নার মধ্যে দেখা যায়—একটি গলা কাটা মহিলা, যার চোয়াল অস্বাভাবিকভাবে নিচে ঝুলে পড়েছে, চোখদুটো রক্তে ডোবা। সে অঙ্কিতার দিকে এগিয়ে আসে, আয়নার ভেতর থেকে বাইরে। ঘরজুড়ে বাতাসটা জমে বরফ হয়ে গেল যেন। ক্যামেরা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল। আর তারপর...?

বেশ কয়েক মাস পর একটি ফুটেজ ইউটিউবে আপলোড হয়, নাম: “REAL POSSESSION CAUGHT ON CAMERA AT BASUVABAN
ভিডিওটা এখনো কেউ হ্যাক করে ডিলিট করেনি। তবে ভিউজ যে খুব একটা বেশি তাও নয়। এমনকি ভিডিওটির কেমেন্ট বক্সও ফাঁকা।
ভিডিওর শেষ ফ্রেমে দেখা যায়—অরিত্র অচেতনভাবে পড়ে আছে ঘরের মেঝেতে, তার পেছনে দাঁড়িয়ে রয়েছে অঙ্কিতা। কিন্তু তার মুখ, তার চোখ… আর আগের মতো নেই।
ক্যামেরা বন্ধ হওয়ার আগের মুহূর্তে অঙ্কিতা ইংরেজিতে কিছু একটা যেন বলে। তবে স্পষ্টভাবে শুনলে বোঝা যাচ্ছে, সে বলেছে - 
"To be Continued..."

টিউশন মাস্টার


ছোট থেকেই সংসারের ভারটা কাঁধে তুলে নিয়েছে সে। বন্ধুরা যখন মাঠে দৌড়াত, মাঠে খেলাধুলা করতো, পাড়ার ঠেকে আড্ডা মারত, আর সে তখন ক্যালকুলেটর হাতে নিয়ে হিসেব করত যে মাসের শেষে কতগুলো টিউশন বাড়ি পেলে ভাত-ডালটা নিশ্চিন্তে জুটবে। দুপুরে ইউনিভার্সিটির ক্লাস শেষ করে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে ছুটে যায় একটার পর একটা বাড়িতে।

 কারও মা বলে, “ওর ইংরেজিটা একটু দুর্বল,” 
কেউ বলে, “অঙ্কটা ভালো করে দেখিয়ে দিও।”

তবু মাসের শেষে দৃশ্যটা একই।
 দরজার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁপা গলায় বলে—“এই মাসের টাকাটা যদি…” 
বাকিটা মুখে আনে না। গলায় আটকে যায় শব্দ। 
তারপর একরাশ হাসি দিয়ে বলে, “থাক, পরে দিলেও হবে।”

সে দেখে তাদের সামনের ঘরে টিভি চলছে, গন্ধ উঠছে সদ্য রান্না করা খাবারের, কিন্তু তার হাতে তখন কেবল একটি পেন, ব্যাগ আর ছেঁড়া একটা কাগজের খাতা। বাড়ি ফিরে আলো-আঁধারিতে খাতার পাতা খোলে সে। অঙ্কগুলো ঠিকঠাক মিলছে, কিন্তু জীবনের অঙ্কটা কিছুতেই মিলছে না। টেবিলের পাশে রাখা চায়ের কাপটা ঠান্ডা হয়ে যায়, তবুও সে খাতার দিকে তাকিয়ে বসে থাকে, আর মাথায় হাজার চিন্তা। 
সে মনে মনে ভাবে "কাল আবার যাব"। 
কারণ তার না গেলে যে সংসারটা থেমে যাবে। মা-বাবার ওষুধ, বোনের টিফিন, নিজের বই এসবই যে সেই টিউশন টাকাটার ওপরেই দাঁড়িয়ে আছে।

রাতে আলো নিভে গেলে একা বসে থাকে সে। ঘরের কোণে বাতাসও তখন ভারী হয়ে ওঠে। কখনও ভাবে, যাদের সে পড়ায়, তারা একদিন বড় হবে, সফল হবে, হয়তো বিদেশেও যাবে। তাদের সার্টিফিকেটে থাকবে স্বপ্নের সই, কিন্তু এই মানুষটার নামটা কোথাও থাকবে না। তবু পরদিন সকাল হলে সে আবার ব্যাগটা তুলে নেয়। 
হাসিমুখে বলে, “চল, আজ ইংরেজিতে Tense টা শেখাই।”

কারণ সে জানে পড়ানোই তার একমাত্র শান্তি, যেখানে যত দুঃখই থাক, বোর্ডে চক তুলে নিলেই সব দুঃখ-কষ্ট কোথায় যেন মিলিয়ে যায়।

হ্যাঁ, সেই টিউশন মাস্টার টা—
যার জীবন মানে পরের ভবিষ্যতের জন্য নিজের বর্তমানকে হারিয়ে ফেলা। তবু মুখে হাসি থাকে, চোখে থাকে নীরব জলের ঝিলিক। কারণ সে জানে এই হাসিটাই তাদের শেষ সম্বল। আর হয়তো সেই হাসিটাই একদিন হয়ে উঠবে তার সবচেয়ে বড় জয়।

পুজো আসছে

 
ভোরবেলা থেকেই বৃষ্টি পড়ছে ঝিরঝির করে। চারপাশে জমে উঠেছে ঠান্ডা, ভেজা একটা গন্ধ। পল্টুর মা তখন রান্নাঘরে কাঁচা লঙ্কা বাটা আর পেঁয়াজ কুচোতে ব্যস্ত। হঠাৎই বাইরে থেকে পল্টু চিৎকার করে উঠলো—

— “মাআআ! ও মাআআ!”

পল্টুর মা অবাক হয়ে মাথা বের করলেন দরজার ফাঁক দিয়ে।

— “কী রে! এত আনন্দের কী হল? লাফাচ্ছিস কেন?”

পল্টু বলল — “মা! কাগজে পুজোবার্ষিকীর বিজ্ঞাপন বেরিয়েছে... বুঝলে ? আসছে মা! সে আসছে! দুর্গা, কাশফুল, আর... আর আনন্দমেলা'র গোয়েন্দা কাহিনি!”

মা একটু হাসলেন, “তা এত আনন্দের কি আছে বাপু ? যেন কি না কি বেরিয়েছে!”

পল্টু— “মা! তুমি বুঝবে না। এই বিজ্ঞাপন মানেই যেন আকাশে ঢাকের শব্দ শোনা যাচ্ছে! এটা একরকম ইশারা—পুজো আসছে! এর চেয়ে বড় সুখ কিছু হয়?”

মা বললেন— “তা বলছিস তো বেশ, আগে স্কুলের হোমওয়ার্ক শেষ কর!”

পল্টু গম্ভীর মুখে বলল— “এই পুজোবার্ষিকীর কাগজটা তো পাঠ্যবইয়েরই একটা অংশ মা! সাহিত্য না পড়লে পরীক্ষা কেমন করে দেব?”

মা মুখে চাপা হাসি চাপতে না পেরে বললেন— “তা হলে সুনীল এর লেখা পড়েই তুই গণিতে ৮৮ পেলি বুঝি?”

পল্টু ঠোঁট কুঁচকে বলল— “সেইটা তো... অন্য বিষয়! ওসব মার্কসের জন্য, আর এটা মন খুশি করার জন্য। দুই আলাদা মা!”

পল্টুর মা  জবাব দিল— “তাই নাকি? ওই সুনীল তো গতবারেও ‘শেষ বেলায় রহস্য’ লেখার পর বলেছিলেন, আর লিখবেন না। এবার আবার এলেন? উনি তো দেখি পেন রেখে উঠে দাঁড়ালেও, আবার বসে পড়েন!”

পল্টু নাক সিঁটকে বলল— “বুদ্ধিহীন প্রজন্ম! পুজো মানেই গোয়েন্দা গল্প। আর সুনীল আবার কি কথা? এমন ভাব করছো যেন তোমার বন্ধু। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলো। আর তাঁর নতুন গল্প একবারই আসে বছরে! ওসব তুমি বুঝবে না।"

মা  বলল— “হা! হা! হা! , বেশ তুই সব বুঝিস। তা হলে আগে সাহিত্যের মতো মুখ গম্ভীর করে বই পড়, আর আমি লুচির বদলে তোর জন্য একটা সাহিত্যমূলক রুটি বানাচ্ছি। নাম হবে—‘আলুভাজা ইন দ্য রেইন’।”

পল্টু চিৎকার করে উঠল— “চুপ করো মা ! সাহিত্য নিয়ে কটাক্ষ করো না! এবার আর সহ্য করব না!”

ওদিকে জানলার বাইরে বৃষ্টি ঝরছে টুপটাপ... আর ঘরের ভিতরে একটুকরো শারদ হাওয়া নেমে এসেছে খবরের কাগজের পাতার ফাঁক দিয়ে।
পুজো মানেই শুধু ঠাকুর দেখা নয় —
পুজো মানে “আসছে পুজোবার্ষিকী”র সেই শিরোনামটা দেখা, পৃষ্ঠার গন্ধ শুঁকে প্রথম গল্পটা কোন লেখকের তা দেখে নেওয়া, আর মা-সন্তানের খুনসুটি, আর লুচির গন্ধে ঘেরা ভোরবেলা।
.
.
.
.
কী তাই তো...?

আমি ছদ্মবেশী ভিখারি

 

আমি ছদ্মবেশী ভিখারি

সেদিন রাত্রে বর্ধমান ফিরছি। স্টেশনের এক ধারে হঠাৎ এক ব্যক্তি আমার নজরে আসে। দেখে মনে হলো ঐ ব্যক্তিটি উচ্চশিক্ষিত, তবে প্রথম থেকেই আমার ধারনাই সঠিক ছিল। ঐ ব্যক্তির কাছে যেতেই ওনার নাম আমি জিজ্ঞাসা করলাম, তবে তিনি সেভাবে কিছুই ওনার নাম এবং তার পরিচয় আমাকে জানালেন না, তবে তিনি আলতো স্বরে যেটা বললেন, সেটা শুনেই আমার পুরো শরীর শিউরে উঠলো। তিনি বললেন- "আমি ছদ্মবেশী ভিখারি"।

যাইহোক নিজের রুমে এসে বসলাম। বাইরে থেকে কেউ একজন আমাকে ডাকছেন সেই ভেবে আমি দরজা খুলতে গেছি। দেখলাম এক ব্যক্তি আমার দিকে একটি কাগজ এগিয়ে দিয়ে বললেন "সাহায্য করবেন বাবু"। কাগজটা না পড়তেই আমি ওনাকে ১০ টাকার একটি নোট দিলাম। তারপর ওনার মুখের দিকে তাকাতেই লক্ষ করলাম উনি কেমন একটা কৌতুহল নিয়ে ঐ ১০ টাকার নোটটি দেখছেন। আমি হেসে বললাম - "হা! হা! হা! , আরে, ঐ নোটটি আসল ,জাল নোট তোমাকে দিই নি"। ব্যক্তিটি আমার দিকে তাকিয়ে বললো - "কে বলেছে আপনাকে নোটটি আসল নাকি নকল সেটা দেখছি। আমি দেখছি অন্যকিছু। "
ব্যক্তিটির কথায় কোন কর্ণপাত করিনি। কারন আমি ভেবেছিলাম লোকটি পাগল। রাত্রে ডিনার সেরে শুয়েছি, হঠাৎ আমার সেই ব্যাক্তির কথা মাথায় আসে যাকে আমি স্টেশনে দেখেছিলাম, সেই ছদ্মবেশী ভিখারী টা। কিছুতেই একটা জিনিস আমি মেলাতে পারছিনা, ভিখারী তাও আবার ছদ্মবেশী?

সকালে ঘুম থেকে উঠে খবরের কাগজ নিয়ে আমি বসে আছি। সঙ্গে এককাপ চা ও আছে। আচমকা আমার নজরে একটি হেডলাইন চোখে পড়লো। যেখানে লেখা -" এক পুরুষের গলাকাটা দেহ উদ্ধার, পুরো শরীর জুড়ে লেখা আমি ছদ্মবেশী ভিখারি "পুরো খবরটি পড়ার পর নিজের মনকে শান্ত করতে পারিনি। ছুট্টে স্টেশনে সেই ছদ্মবেশী ভিখারি টার কাছে আমি পৌঁছায়, কিন্তু আমি তাকে স্টেশন চত্বরে কোত্থাও খুঁজে পাইনি। স্টেশনের বাইরে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছি, এমনি সময় আমি দেখতে পাই সেই ছদ্মবেশী ভিখারি টাকে। তবে তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে আজ বেজায় খুশি। আমি সমস্ত কিছু উপেক্ষা না করেই তার কাছে যায়। তার সাথে আলাপচারিতার জন্য তাকে ১০ টাকার একটি নোট দিলাম,সে টাকাটা পেয়েই নোটটি আসল নাকি নকল যাচাই করে নিলো। অবাকও হলাম, কারন, গতরাত্রেই এক ব্যক্তি এমনটাই করেছিলো। ঐ ভিখারি টাকে আমি বললাম তুমি নিজেকে ছদ্মবেশী ভিখারি কেন বলছো? সে আমার দিকে তাকালো কিন্তু কোন জবাব দিলোনা। কিছুতেই একটা জিনিস আমি মেলাতে পারছিনা, খবরের কাগজের শিরোনাম আর এই ছদ্মবেশী ভিখারির আসল নাম।

পরের দিন সকালে আমি ইউনিভার্সিটি যাবার জন্য রাস্তায় টোটো ধরবার জন্য দাঁড়িয়ে আছি। দূর থেকে দেখতে পাই সেই ছদ্মবেশী ভিখারি টাকে। এদিকে আমার মাথার মধ্যে হাজার ভাবনা আসছে যে এই ভিখারি টাই গতকাল খবরের কাগজে পড়া সেই ব্যক্তি কে খুন করেনি তো...।
যাইহোক,তার কাছে আমি পৌঁছায়, কিন্তূ আজ দেখছি সে মুখে কোন কথা বলছে না। রাস্তার লোকজন এর কাছে খবর পাই উনি নাকি বোবা। আমি আরো বেশি আশ্চর্য হয়ে পড়ি, কারন এই ব্যক্তি কে আমি গত দুদিন ধরে দেখছি আর সে আমার সাথে কথাও বলেছে , কিন্তূ আজ সে নাকি বোবা এটা আমি মেনে নিতে পারলাম না। আমি ঠিক করেছি আজ এই ব্যক্তি অর্থাৎ ছদ্মবেশী ভিখারিটার সাথেই সারাক্ষণ কাটাবো,তাও সবার আড়ালে। সারাটা সন্ধ্যে ঐ ভিখারি টা রাস্তার ধারেই ভিক্ষা করে কাটালো। রাত্রি গড়িয়ে আসে। বাজার প্রায় বন্ধের মুখেই। আমি আড়াল থেকে লক্ষ্য করলাম ঐ ভিখারি টা তার সমস্ত সরঞ্জাম নিয়ে এগিয়ে চলেছে। আমিও তার পিছনেই আছি,আর তাকে লক্ষ্য করছি। ঐ ভিখারি টা একটি অন্ধকার জলাশয়ের ধারে দাঁড়িয়ে আছে। আর হ্যাঁ ,এই জলাশয়ের বর্ননা আমি গতকাল খবরের কাগজে পড়েছিলাম যেখানে সেই গলাকাটা লাশের ঘটনা টি ছিল। আমি ভেবেছিলাম থানায় খবর দেবো। ফোনটা বাড় করতেই আমি দেখতে পেলাম ঐ ভিখারি টি চিৎকার করে হাসছে আর বলছে "আমি ছদ্মবেশী ভিখারি"। তবে এত ভয়ঙ্কর ঘটনা আমার সাথে এর আগে কখনো ঘটেনি।
আমি তার দিকে এগিয়ে গেলাম। তাকে কাঁধে হাত দিয়ে ডাকলাম। সে পিছন ঘুরে আমাকে দেখে আর বলে- " ও আপনি?"
আমি তাকে বললাম আপনি কথা বলতে পারেন? আর সকালে তো আমি শুনলাম যে আপনি নাকি কথা বলতে পারেন না। আপনি তো বোবা। ভিখারি টা হেসে উত্তর দিলো -"কে বলেছে আমি বোবা? আর আপনি এখানে কেন এসেছেন?" আমি তার কথার কোন উত্তর দিলাম না। শুধু জিজ্ঞাসা করলাম আপনার এরকম অবস্থা কেন?
ভিখারি টা বললো -"আজ থেকে প্রায় তিন বছর আগে আমি প্রাইভেট সেক্টরে একটি চাকরি করতাম। পরিবারের অবস্থা তেমন ভালো ছিল না। একদিন নিশুতি রাত্রে এই জলাশয়ের পাশ দিয়ে আমি বাড়ি ফিরছি। দেখলাম আমার স্ত্রী, মা ,ছোট বোন সকলেই এই জলাশয়ের ধারে পড়ে আছে। তাদের কে খুন করা হয়েছিলো। আমি প্রচন্ড ভেঙে পড়েছিলাম। কিছুতেই কারন অনুসন্ধান করতে পারিনি,যে কী কারনে তাদের কে খুন করা হয়েছে? আমি থানায় অভিযোগ দায়ের করার জন্য গেলেও পুলিশ আমাকে থানা থেকে বের করে দেন। কিন্তু আমি একটা সূত্র পেয়েছিলাম। আমার পরিবারের মৃতদেহের এক পাশে একটা ১০ টাকার নোট পড়ে থাকতে দেখি। "
আমি অবাক হয়ে বললাম- "১০ টাকার নোট?"
ভিখারি টা বললো -" হ্যাঁ ১০ টাকার নোট। আমি কাজে বেরোনোর আগে আমার ছোট বোন কে চকলেট কেনার জন্য ১০টাকা দিয়েছিলাম । কিন্তু ঐ ১০ টাকা নোটের ওপরে রক্ত দিয়ে লেখা আমি ছদ্মবেশী ভিখারি"।
হঠাৎ আমি একটা জোরালো আওয়াজ শুনতে পেলাম। চোখ খুলতেই দেখি সকাল হয়ে গেছে। আর জোরালো আওয়াজ টা ছিল আমার অ্যালার্ম ঘড়ির। এতক্ষণ যা ছিলো সবটুকু এক দুঃস্বপ্ন।
তবে এই ছদ্মবেশী ভিখারি টার কথা কি আমি আর কখনো জানতে পারবো না? কি ছিল তার পরিচয়? আর কেন তার পুরো পরিবার কে হত্যা করা হয়েছিলো সে সবটুকু কি আমার কাছে অজানা থেকে যাবে?
যাইহোক তবে আমার মনে থাকবে স্টেশনে এবং জলাশয়ের ধারে তার বলা কথা -

" আমি ছদ্মবেশী ভিখারি..."।

আমাকে আর খুঁজো না

 
তোমার মনে আছে?
সেই বিকেলটা—
যখন তুমি রেগে চলে গেলে, আর আমি কিছুই বলিনি।তোমার চলে যাওয়াটার কোন শব্দ ছিল না,শুধু হাওয়ায় ভেসে ছিল একগুচ্ছ কিছু না বলা কথা।সেইদিনের পর থেকে, আমি আর কিছুই সেরকম লিখিনি।
 কিন্তূ আজ লিখছি। 

হ্যাঁ, আমি সেই তুহিন ...
যার নামটা তুমি আর উচ্চারণ করো না আজকাল, শুধু আজ স্মৃতির পাতায় সেটা ঘোলাটে কালি হয়ে ছড়িয়ে আছে। আমি হারিয়ে যাইনি। আমি থাকি— সেইসব জায়গায়, যেখানে তুমি দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলো। তুমি বুঝেছো,এ কোনো আত্মহত্যা নয়,এ প্রেমের চূড়ান্ত পরিণতি। তবু প্রতি রাতে তুমি ঘুমোনোর আগে তাকাও জানালার বাইরে,
 যেখানে একফালি চাঁদ হেসে বলে—
“সে তো এখনো আছে, তোমার সমস্ত না বলা কথার ভেতরে…”
তবুও আমি আছি—
সেই গানটার মধ্যে —"তোমাকে বুঝিনা প্রিয়", যেটা শুনলে তোমার মনে পড়ে যেত, এটা আমার প্রিয় গান ছিল!
আমি আছি সেই পুরনো বারান্দার ধারে,
যেখানে বসে একদিন লিখেছিলাম “তোমাকে আমি খুঁজি প্রতিটি ক্যাফেটেরিয়াতে।” হয়ত লেখাটি তুমি পড়েছ।
তুমি আমায় খোঁজো, আমি জানি। রাত্রি যত গভীর হয়, তোমার খোঁজ ততই গভীর হয়।
কিন্তু এখন…
আমাকে আর খুঁজো না।
কারণ আমি এখন আর খুঁজে পাবো না তোমায়, আমার মধ্যেও তুমি আজ কুয়াশার মতো ঝাপসা। তবু যদি কখনও কারও চোখে আমায় চিনে ফেলো,
যদি কোনো কবিতার লাইনে আমার নাম ধরে ফেলো তখন শুধু চুপটি করে হাসবে, আর ভাববে— এই নীরবতাটাই বোধহয় শেষ ভালোবাসা ছিল। 
আমি জানি, আমরা আর একসঙ্গে থাকি না, তবু ভালোবাসাটা কোথাও ঠিক রয়ে গেছে সময়ের একটা বন্ধ ঘরে, যার দরজায় লেখা— 

আমাকে আর খুঁজো না।”
ছবি - সংগৃহিত


আমি বেশ্যার মেয়ে


আমি বেশ্যার মেয়ে

রূপার জন্ম সোনাগাছির এক গুমোট রাতে, যখন ঘুঙরুর শব্দ আর সস্তা সুরার গন্ধে বাতাস ভারী ছিল। তার মা চম্পা, এককালে প্রেমে পড়ে ঘর ছেড়েছিল, পরে ফিরে এসেছিল ভাঙা শরীর আর ভাঙা মন নিয়ে। সোনাগাছির দালাল তাকে বলেছিল, “যা ভেঙেছে, তা-ই এবার চালাও।” সেই পাঁকেই জন্ম রূপার।
 সমাজ রূপাকে ‘বেশ্যার মেয়ে’ বলে ছিঁড়ে খেয়েছে। 

রূপা প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে পায় কলমে। রূপার শব্দগুলো রূপ পায় অস্ত্রে। কলেজে সে চুপিচুপি প্রেমে পড়ে অর্কর, কিন্তু সত্য জানতে পারার পর অর্কও পিছিয়ে যায়। তখনই রূপা বুঝে, সে আর কেবল প্রেমে নয়—প্রতিবাদেই বাঁচবে।

তার কলেজের এক ছাত্রীর ধর্ষণের ঘটনায় সে দাঁড়ায়—প্ল্যাকার্ড হাতে, গলায় আগুন। সবাই চমকে যায়—“সোনাগাছির মেয়ে এখন মুখ খুলেছে!” রূপা বলে, “আমরা শুধু শরীর নই, প্রতিবাদের শরীর।”
একদিন রূপা যখন দরজা খুলে ঘরে ঢুকল, চম্পা বলে উঠল,
— “আজকাল তুই ঘরে কম আসিস। তুই এখন বড়লোক হইছিস না?”
 চম্পা বলেছিল, কিভাবে সতেরো বছর বয়সে এক গার্মেন্টস শ্রমিকের প্রেমে পড়ে তার সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছিল। তারপর ভগ্ন গর্ভে ফিরেছিল শহরে। — “আমি কাউকে দোষ দিই না রূপা। কিন্তু নিজের শরীর যখন বিক্রি করতে শুরু করলাম, তখন প্রতিদিন একটু করে মরে গেছি।” রূপা বলেছিল,
— “তুই মরিসনি মা। তুই আমাকে বাঁচিয়েছিস। তুই নিজের দেহ হারিয়ে আমার আত্মা রক্ষা করেছিস।” 
এভাবেই বেশ কিছুদিন কেটে যায় চম্পা ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হয়। হাসপাতালে ভর্তি করতে চেয়েছিল রূপা, কিন্তু চম্পা বলেছিল,
— “না রে, আমি গন্ধবাজারেই মরতে চাই। এখানেই আমার জীবন গেছে, এখানেই আমার মৃত্যু হোক।” রূপা বোঝে, মৃত্যুর চেয়ে জায়গার স্বীকৃতিই বড় হয়ে উঠেছে তার মায়ের কাছে।
একদিন সকালে রূপা তার কপালে হাত রেখে দেখল—চম্পা চোখ খুলে আছে, কিন্তু ঠোঁটে একরাশ প্রশান্তি।
তবে হঠাৎ সে ফিসফিসিয়ে বলল, — “আমার মুখটা ঢেকে দিস না রূপা। আমি চাই সবাই দেখুক, এই মুখ কেমন ছিল যে সমাজ এতটা ঘৃণা করত।” 
সেই মৃত্যুই যেন রূপার জীবনের সবচেয়ে বড় দায় হয়ে উঠল।
এর কিছুদিন পর, রূপা প্রতিষ্ঠা করল এক সংগঠন—“স্বরজ”।
নাম রাখল মায়ের স্মৃতিতে—স্বর আর মুক্তির মিলনস্থল।
সেখানে যৌনপল্লির মেয়েরা পড়াশোনা করে, আত্মরক্ষার ক্লাস নেয়, শিল্প শেখে, কবিতা লেখে। 
এভাবেই বেশ কিছুদিন কেটে যায়। এক সন্ধ্যায়, এক মঞ্চে দাঁড়িয়ে রূপা উচ্চারণ করেছিল তার জীবনের সারাংশ—
“আমি বেশ্যার মেয়ে। এই সমাজে এই পরিচয়টা গালি।আমি সেই গালিকে গর্ব বানিয়েছি। আমি কেবল আমার শরীর নয়, আমার ইতিহাস নিয়েও দাঁড়িয়েছি।”

যেখানে রূপা এই বক্তৃতা দিয়েছিলো সেই হল জুড়ে তখন নীরবতা। তারপর করতালি। তবে রূপার চোখে শুধু চম্পার মুখ কোনো রক্তমাংসের নয়, এক তেজস্বী ছায়ার মুখ, যে তার বুকের ভেতর থেকে বলে উঠছে— 
“তুই পেরেছিস, রূপা। তুই সত্যিই পেরেছিস।”

তোমাকে আমি খুঁজি প্রতিটি ক্যাফেটেরিয়াতে

 

তোমাকে আমি খুঁজি প্রতিটি ক্যাফেটেরিয়াতে


তুমি চলে যাওয়ার পর শহরটা বদলায়নি, কিন্তু প্রতিটি কোণা যেন একটু করে ফাঁকা হয়ে গেছে। তুমি ছিলে বলেই হয়তো জানালার পাশে বসা মানে ছিল একরকম ঘরবন্দি ভালোবাসা। এখন সেই জানালার পাশের চেয়ারটা শুধু হাওয়ায় দোলে, কিন্তু আমি আর তাকাই না। তোমাকে আমি খুঁজি সেই চেনা চশমার ফ্রেমের পিছনে লুকিয়ে থাকা দুটো না বলা কথায়, যা একদিন আমাকে নিরবে বলে দিয়েছিল

—‌ থেকে যেও...

 তবু আমি বুঝিনি, হয়তো বোঝার অভিনয় করেছিলাম। 

তোমাকে আমি খুঁজি প্রতিটি ক্যাফেটেরিয়াতে।
কারণ আমি জানি, একদিন যদি তুমি ফিরে আসো—এখানেই আসবে। এক কাপ কফি নেবে, জানালার ধারে বসবে, আর মুচকি হেসে বলবে,

— তুমি এখনও বসে আছো?

আর আমি বলব,

— এই চেয়ারটা তো কখনও খালি হয়নি। 

তুমি তো শুধু চলে যাওনি। তুমি রেখে গেছো হাজারটা অভ্যেস, যেগুলো আমি আজও ত্যাগ করতে পারিনি। তোমার চলে যাওয়ার দিনে বাজছিল যে গানটা, সেটি প্রতিবার ক্যাফের স্পিকারে শুনলেই আমি নিঃশব্দে কাঁদি। হ্যাঁ, তোমাকে আমি আজও খুঁজি প্রতিটি ক্যাফেটেরিয়াতে। এ শুধু একদিনের অভ্যাস নয়, এ আমার সমস্ত জীবনের প্রেম। এক অসমাপ্ত ভালোবাসা। এক কাপ; একতরফা কফি।

একদিন এই ক্যাফেতেই বসে ছিলাম। অফিসপাড়া খালি হয়ে আসছিল। ঠিক তখন এক মেয়ে দরজা ঠেলে ঢুকল—চুলটা বাঁধা, চোখে হালকা কাজল। মনে হলো মেয়েটি তুমি। হৃদয়টা একটু হলেও থমকে গেছিল। কিন্তু সে যখন পাশের টেবিলে গিয়ে বসল, আমি বুঝলাম, ভুল করলাম—আবার।  আজকাল আর এই ক্যাফেতে যাওয়া হয় না, আসলে যেতে ইচ্ছে হয় না।

আমি জানি, তুমি আর কখনোই এখানে আসবে না। 

তবু, তবু— 
'তোমাকে আমি খুঁজি প্রতিটি ক্যাফেটেরিয়াতে।'

একটু দাঁড়িয়ে যাবি ?


 
লেখক :- দেবরাজ সাহা 

ছেলেটির নাম মৈনাক, মেয়েটি অন্বেষা।
তিন নম্বর বাসে রোজ একসঙ্গে স্কুলে যাওয়া, একই টিউশনে বসে মাথা গোঁজার নাম করে চোখাচোখি, আর সন্ধ্যেবেলায় বাড়ির পাশে কুমোরটুলির গলিতে দাঁড়িয়ে থাকা—এই ছিল ওদের প্রেমের সবটা পৃথিবী।

অন্বেষা খুব হাসত, মৈনাক বলত, “তোর হাসিটাই আমার প্রিয় ঋতু।”
একদিন, এক শীতে, মৈনাক চুপচাপ হাতে একটা ছোট ফুল এনে বলেছিল,
“তুই চুলে পরবি এটা?”
অন্বেষা একটু লাজুক হয়ে বলেছিল,
“সবাই দেখবে তো…”
মৈনাক বলেছিল,
“তাহলে চোখ বন্ধ কর, আমি গুঁজে দিচ্ছি।”

ছবিটা সেই মুহূর্তের। সেই এক চিলতে স্বপ্নের।

এর কিছুদিন পরেই মৈনাক এর মা মারা যায়। আর্থিক চাপ, সংসারের হাল ধরতে সে আর কলেজে ভর্তি হতে পারেনি। সব শেষে একটা ফার্মেসিতে কাজ নেয়।
অন্বেষা ডাক্তারি পরীক্ষায় পাশ করে, কলকাতা চলে যায়।

সেই যে গেল, আর ফিরল কই?

মেসেঞ্জারে কিছুদিন যোগাযোগ ছিল। তারপর ধীরে ধীরে উত্তর আসা বন্ধ। মৈনাক বুঝে গিয়েছিল—অন্বেষার জীবনের গতি অনেক দূরে চলে গেছে।
কিন্তু মৈনাক কখনোই রাগ করেনি। কষ্টও হয়নি খুব একটা। শুধু মাঝে মাঝে কুমোরটুলির গলি দিয়ে গেলে একটু থেমে দাঁড়ায়।
একদিন বন্ধুকে বলেছিল,
“জানিস, ও একদিন বলেছিল—‘তুই একটা ফুল গুঁজে দিলে আমি চিরকাল সেটা রেখে দেব’।”
বন্ধু অবাক হয়ে বলেছিল,
“তুই তো জানিস, এখন ওর বিয়ের কথা চলছে, ও তো তোকে ভুলেই গেছে।”
মৈনাক মাথা নিচু করে হেসেছিল। বলেছিল,
“আমার কাছে ভালোবাসা মানে ওর মনে থাকা নয়,
ভালোবাসা মানে—ওর মাথায় এখনো একটা ফুল গোঁজা আছে কি না, সেটা ভাববার সুযোগ রাখা।”

অনেক বছর পর কলকাতার এক মেডিকেল কনফারেন্সে অন্বেষা দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিচ্ছিল। ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ চোখে পড়ল একটা চেনা মুখ—পিছন সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা এক যুবক, সাধারণ পোশাকে, মুখে সেই পুরনো হাসি।

অন্বেষার চোখ ভিজে গিয়েছিল।  বক্তৃতা শেষ করে ছুটে গিয়েছিল।
কিন্তু মৈনাক তখন আর নেই।
শুধু চেয়ারটায় রাখা ছিল একটা খাম।
তার ভিতরে লেখা—

"তুই একদিন বলেছিলি, ‘একটু দাঁড়িয়ে যাবি?’
আমি দাঁড়িয়ে গেছিলাম।
আজ যাচ্ছি।
তোর পথ অনেক বড়, আমার পথ এখানেই ফুরোল।
শুভ হোক তোর জীবন,
—মৈনাক”

অন্বেষা সেদিন বুঝেছিল—সব ভালোবাসার গল্প বিয়েতে শেষ হয় না। কিছু গল্প কেবল এক মুহূর্তে জন্মায়, আর চিরকাল একটা গলির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকে।
শুধু একটিবার দেখা হয়ে গেলে... হয়তো সবটাই বদলে যেত।

শেষ নয়, কখনও শেষ হয় না। কিছু ভালোবাসা স্রেফ বেঁচে থাকে… এক মুহূর্তের মতো। একটা ফুলের মতো। “একটু দাঁড়িয়ে যাবি?” এই প্রশ্নের মতো।