Featured post

DEBRAJ SAHA TITLE SONG

A special song has been dedicated to Debraj Saha on the occasion of his 24th birth anniversary by MusicFul Hub. The entire vide...

আমি বেশ্যার মেয়ে


আমি বেশ্যার মেয়ে

রূপার জন্ম সোনাগাছির এক গুমোট রাতে, যখন ঘুঙরুর শব্দ আর সস্তা সুরার গন্ধে বাতাস ভারী ছিল। তার মা চম্পা, এককালে প্রেমে পড়ে ঘর ছেড়েছিল, পরে ফিরে এসেছিল ভাঙা শরীর আর ভাঙা মন নিয়ে। সোনাগাছির দালাল তাকে বলেছিল, “যা ভেঙেছে, তা-ই এবার চালাও।” সেই পাঁকেই জন্ম রূপার।
 সমাজ রূপাকে ‘বেশ্যার মেয়ে’ বলে ছিঁড়ে খেয়েছে। 

রূপা প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে পায় কলমে। রূপার শব্দগুলো রূপ পায় অস্ত্রে। কলেজে সে চুপিচুপি প্রেমে পড়ে অর্কর, কিন্তু সত্য জানতে পারার পর অর্কও পিছিয়ে যায়। তখনই রূপা বুঝে, সে আর কেবল প্রেমে নয়—প্রতিবাদেই বাঁচবে।

তার কলেজের এক ছাত্রীর ধর্ষণের ঘটনায় সে দাঁড়ায়—প্ল্যাকার্ড হাতে, গলায় আগুন। সবাই চমকে যায়—“সোনাগাছির মেয়ে এখন মুখ খুলেছে!” রূপা বলে, “আমরা শুধু শরীর নই, প্রতিবাদের শরীর।”
একদিন রূপা যখন দরজা খুলে ঘরে ঢুকল, চম্পা বলে উঠল,
— “আজকাল তুই ঘরে কম আসিস। তুই এখন বড়লোক হইছিস না?”
 চম্পা বলেছিল, কিভাবে সতেরো বছর বয়সে এক গার্মেন্টস শ্রমিকের প্রেমে পড়ে তার সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছিল। তারপর ভগ্ন গর্ভে ফিরেছিল শহরে। — “আমি কাউকে দোষ দিই না রূপা। কিন্তু নিজের শরীর যখন বিক্রি করতে শুরু করলাম, তখন প্রতিদিন একটু করে মরে গেছি।” রূপা বলেছিল,
— “তুই মরিসনি মা। তুই আমাকে বাঁচিয়েছিস। তুই নিজের দেহ হারিয়ে আমার আত্মা রক্ষা করেছিস।” 
এভাবেই বেশ কিছুদিন কেটে যায় চম্পা ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হয়। হাসপাতালে ভর্তি করতে চেয়েছিল রূপা, কিন্তু চম্পা বলেছিল,
— “না রে, আমি গন্ধবাজারেই মরতে চাই। এখানেই আমার জীবন গেছে, এখানেই আমার মৃত্যু হোক।” রূপা বোঝে, মৃত্যুর চেয়ে জায়গার স্বীকৃতিই বড় হয়ে উঠেছে তার মায়ের কাছে।
একদিন সকালে রূপা তার কপালে হাত রেখে দেখল—চম্পা চোখ খুলে আছে, কিন্তু ঠোঁটে একরাশ প্রশান্তি।
তবে হঠাৎ সে ফিসফিসিয়ে বলল, — “আমার মুখটা ঢেকে দিস না রূপা। আমি চাই সবাই দেখুক, এই মুখ কেমন ছিল যে সমাজ এতটা ঘৃণা করত।” 
সেই মৃত্যুই যেন রূপার জীবনের সবচেয়ে বড় দায় হয়ে উঠল।
এর কিছুদিন পর, রূপা প্রতিষ্ঠা করল এক সংগঠন—“স্বরজ”।
নাম রাখল মায়ের স্মৃতিতে—স্বর আর মুক্তির মিলনস্থল।
সেখানে যৌনপল্লির মেয়েরা পড়াশোনা করে, আত্মরক্ষার ক্লাস নেয়, শিল্প শেখে, কবিতা লেখে। 
এভাবেই বেশ কিছুদিন কেটে যায়। এক সন্ধ্যায়, এক মঞ্চে দাঁড়িয়ে রূপা উচ্চারণ করেছিল তার জীবনের সারাংশ—
“আমি বেশ্যার মেয়ে। এই সমাজে এই পরিচয়টা গালি।আমি সেই গালিকে গর্ব বানিয়েছি। আমি কেবল আমার শরীর নয়, আমার ইতিহাস নিয়েও দাঁড়িয়েছি।”

যেখানে রূপা এই বক্তৃতা দিয়েছিলো সেই হল জুড়ে তখন নীরবতা। তারপর করতালি। তবে রূপার চোখে শুধু চম্পার মুখ কোনো রক্তমাংসের নয়, এক তেজস্বী ছায়ার মুখ, যে তার বুকের ভেতর থেকে বলে উঠছে— 
“তুই পেরেছিস, রূপা। তুই সত্যিই পেরেছিস।”

No comments:

Post a Comment