Featured post

প্রাপ্তি

♥️ প্রাপ্তির খাতায় জমে থাকা কিছু মুহূর্ত  ♥️ ★ তাৎক্ষণিক বক্তৃতা, তৃতীয়, পুরন্দরপুর উচ্চ বিদ্যালয়, দাতা— শোভা মন্ডল, তাপাইপু...

Showing posts with label সম্পাদকীয়. Show all posts
Showing posts with label সম্পাদকীয়. Show all posts

SIR: নাগরিক যাচাই না কি রাজনৈতিক চাল!

বাংলা সহ দেশের বারোটি রাজ্যে শুরু হতে চলেছে SIR (Special Intensive Revision)। সাধারণভাবে এটি নির্বাচন কমিশনের একটি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। যেখানে ভোটার তালিকা, সংশোধন ও নতুন নাম সংযোজন করা হয়। কিন্তু এর গভীরে তাকালে বোঝা যায় এটি কেবল নামের তালিকা নয়, এটি আমাদের নাগরিক অস্তিত্বের একটি দলিল, আমাদের গণতন্ত্রে অংশগ্রহণের ন্যূনতম অধিকার। 
আজকের দিনে পরিচয়ের রাজনীতি যত জটিল হয়ে উঠেছে, ততই এই ধরনের প্রক্রিয়াগুলি এক গভীর সামাজিক তাৎপর্য বহন করে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছেন, সোমবার রাত ১২টা থেকে ভোটার তালিকা ‘ফ্রিজ’ করে দেওয়া হবে। অর্থাৎ এরপর থেকে পুরনো তথ্য বন্ধ হয়ে যাবে এবং নতুন করে যাচাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু হবে। BLO বা বুথ-লেভেল অফিসাররা মঙ্গলবার থেকেই মাঠে নামবেন। তাঁরা প্রতিটি পাড়ায়, প্রতিটি ঘরে গিয়ে যাচাই করবেন কারা ভোটার তালিকায় আছেন, কারা বাদ পড়েছেন, আর নতুনভাবে কাকে যুক্ত করা যায়। তিন দফায় ভেরিফিকেশন চলবে। যাতে কোনো যোগ্য নাগরিক বাদ না যান এবং কোনো ভুয়ো নাম যুক্ত না হয়। এছাড়াও প্রবীণ ও অক্ষম নাগরিকদের জন্য অনলাইন ফর্ম পূরণের সুবিধা রাখা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে প্রযুক্তির নাগরিকীকরণের এক ইতিবাচক দিক। কিন্তু এর সঙ্গে একটা বড় প্রশ্নও থেকে যায়, আমরা কি যথেষ্ট সচেতন?

প্রায়ই দেখা যায়, নাগরিকরা ভোটের ঠিক আগেই বুঝতে পারেন তাঁদের নাম তালিকায় নেই, বা ঠিকানায় ভুল হয়েছে। অথবা তথ্যগত ত্রুটি। অথচ সংশোধনের এই সময়টাতেই সেই ভুল শুধরে নেওয়ার সুযোগ থাকে। আমাদের অনেকের কাছে ভোট কেবল নির্বাচনের দিনে একদিনের ঘটনা, কিন্তু SIR-এর মতো প্রক্রিয়াই আসলে সেই প্রস্তুতির ভিত্তি তৈরি করে। এখানেই নাগরিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নটি এসে দাঁড়ায়। গণতন্ত্র কেবল শাসকের দায় নয়, একজন নাগরিকেরও প্রতিশ্রুতি। তালিকায় নিজের নাম নিশ্চিত করা, তথ্য যাচাই করা, প্রয়োজনে আপডেট করা, এগুলোই সেই প্রতিশ্রুতির সূক্ষ্ম প্রকাশ।অনেক সময় শহুরে উদাসীনতার আড়ালে আমরা ভুলে যাই যে এই ছোট ছোট কাজগুলোই রাষ্ট্রের বৃহৎ কাঠামোকে সচল রাখে। তবে এই প্রক্রিয়ায় কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। মাঠ পর্যায়ে BLO-দের কাজ নিঃসন্দেহে কঠিন। আর রাজনৈতিক চাপ, তথ্যভ্রান্তি ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা অনেক সময় স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তাই নির্বাচন কমিশনের উচিত পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও তদারকির মাধ্যমে এই ব্যবস্থাকে আরও নির্ভরযোগ্য করে তোলা। তেমনি নাগরিক সমাজ, স্থানীয় সংগঠন ও রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত মানুষকে সচেতন করা যাতে কেউ বাদ না পড়ে, কেউ বিভ্রান্ত না হয়। SIR এর এই প্রক্রিয়াকে অনেকেই নিছক সরকারি কাজ হিসেবে দেখছেন। কিন্তু আমার মতে, এটি আসলে গণতন্ত্রের আত্মপরীক্ষা। ভোটার তালিকা মানে কেবল নামের তালিকা নয়, এটি নাগরিক স্বীকৃতির এক নৈতিক প্রতিফলন। আমরা প্রায়ই দেখি, ভোটের সময় অভিযোগ ওঠে কেউ ভোট দিতে পারেননি, কারও নাম বাদ গেছে, আবার কোথাও মৃত বা অপ্রাসঙ্গিক নাম রয়ে গেছে তালিকায়। এই অভিযোগগুলোর মূল কারণ নাগরিক সচেতনতার অভাব এবং প্রশাসনিক অসতর্কতা, যা SIR-এর মতো প্রক্রিয়ার সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে রোধ করা সম্ভব। তবে শুধু প্রশাসন নয়, দায় আমাদেরও। গণতন্ত্রে নাগরিকের ভূমিকা কেবল ভোট দেওয়া নয়, ভোটের আগে নিজের অস্তিত্ব নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নিজের নাম তালিকায় আছে কি না, ঠিকানা সঠিক কি না, বা নতুন প্রজন্মের নাম যুক্ত হয়েছে কি না এই ছোটখাটো যাচাইয়ের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিপক্বতা। SIR আমাদের সেই প্রশ্নটাই মনে করিয়ে দেয় আমরা কতটা সচেতন নাগরিক। আমরা কি সত্যিই আমাদের অধিকারকে মূল্য দিই, নাকি প্রশাসনের ওপরই সব দায় চাপিয়ে নিশ্চিন্ত থাকি?

আমার বিশ্বাস, এই প্রক্রিয়া যত বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে, ততই আমাদের গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে। প্রত্যেক নাগরিকের নাম তালিকায় থাকা মানে একেকটি জীবন রাষ্ট্রের গণনায় ধরা পড়ছে যার কণ্ঠস্বর ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্র গঠন করবে। অন্যদিকে, যদি নাগরিক নিজে উদাসীন থাকে, তাহলে গণতন্ত্র ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। তাই SIR কেবল একটি নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব নয় এটি আমাদের নাগরিক চেতনার প্রতিফলন। কিন্তু বাস্তবে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। অনেক সময় BLO-দের সংখ্যা যথেষ্ট নয়, তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়। এবং সাধারণ মানুষের কাছে পরিষ্কার ধারণা পৌঁছায়।

বিশেষত গ্রামীণ এলাকায় অনেকে জানেনই না যে এখনই তালিকা সংশোধনের সময় চলছে। ফলে সচেতনতার অভাবে বহু যোগ্য ভোটার বাদ পড়ে যান। আরও একটি সমস্যা হল প্রযুক্তিগত ব্যবধান। অনলাইন ফর্মের সুযোগ থাকলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ এখনও ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় অভ্যস্ত নন। তাই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য বাস্তবে পুরোপুরি সফল হতে হলে সচেতনতা এবং সহায়তা দুই দিকেই জোর দিতে হবে। 
বাংলার প্রেক্ষাপটে, যেখানে রাজনৈতিক মেরুকরণ গভীর, সেখানে SIR-কে ঘিরে আশঙ্কা এবং প্রত্যাশা দুটোই রয়েছে। একদিকে শাসকদল বলছে, “সব নাগরিকের নাম যেন তালিকায় থাকে, সেটাই লক্ষ্য।” অন্যদিকে বিরোধীরা অভিযোগ তোলে—“বিভিন্ন এলাকায় ভুয়ো নাম রয়ে গেছে বা নতুন ভোটার যুক্ত হতে পারছেন না।” রাজ্যে বা কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দল প্রায়ই এই প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করে। কখনও নাম বাদ দেওয়া, কখনও নির্দিষ্ট এলাকা বিশেষে যোগ-বিয়োগের অভিযোগ ওঠে। তাই নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এখানে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

বাস্তবতা হচ্ছে রাজনৈতিক স্বার্থের টানাপোড়েনের মাঝেও যদি প্রশাসন নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে পারে, তাহলেই SIR সত্যিকারের অর্থে মানুষের প্রক্রিয়া হয়ে উঠবে, রাজনৈতিক তকমা ছাড়াই।‌ তবে গণতন্ত্রের সাফল্য কখনো সংখ্যার উপর নির্ভর করে না, এটি নির্ভর করে সেই সংখ্যাগুলোর স্বচ্ছতার উপর। SIR সেই স্বচ্ছতাকে প্রতিষ্ঠা করার লড়াই, যেখানে রাজনীতি ও প্রশাসনের সীমানা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে সাধারণ মানুষ তার নিজের পরিচয়ের স্বীকৃতির অপেক্ষায়। তবে এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে নাগরিক অংশগ্রহণের ওপর।


এসআইআর – ভোটার তালিকা সংশোধন, না কি ভোটার সংশোধন!


 ৪ নভেম্বর থেকে পশ্চিমবঙ্গে শুরু হয়েছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (Special Intensive Revision)বা সংক্ষেপে এসআইআর। প্রায় তেইশ বছর পর এই প্রক্রিয়া ফের শুরু হওয়ায় একদিকে প্রশাসনিক তৎপরতা বাড়লেও, অন্যদিকে সৃষ্টি হয়েছে বিভ্রান্তি, সংশয় এবং ভয়ের আবহ। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে এখন বুথ লেভেল অফিসাররা (BLO) ঘরে ঘরে গিয়ে ভোটারদের এনুমারেশন ফর্ম বিলি করছেন, তথ্য সংগ্রহ করছেন। গণতন্ত্রে ভোটার তালিকা শুদ্ধকরণ নিঃসন্দেহে জরুরি, কিন্তু প্রশ্ন উঠছে এই প্রস্তুতি কতটা পরিপক্ব, কতটা স্বচ্ছ, এবং কতটা মানবিক? 
কমিশন জানিয়েছে, এবার নাগরিকরা অনলাইনেও ফর্ম পূরণ করতে পারবেন। কিন্তু প্রথম দিন থেকেই সার্ভার বিপর্যয়, ওয়েবসাইট ডাউন থাকা, লগইন সংক্রান্ত সমস্যা দেখা দেয়। বহু মানুষ অভিযোগ জানিয়েছেন যে, পোর্টাল খোলা যাচ্ছিল না, অথবা তথ্য সেভ হচ্ছিল না। প্রযুক্তির যুগে এমন মৌলিক প্রশাসনিক ব্যর্থতা নিঃসন্দেহে প্রশাসনের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। আমার মতে গণতন্ত্রে তথ্যপ্রযুক্তি নাগরিকের বন্ধু হওয়ার কথা, কিন্তু আমাদের বাস্তবতায় সেটি প্রায়ই নাগরিকের প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। যাঁরা রাজ্যের বাইরে কর্মরত, বা যাঁরা প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ নন তাঁদের কাছে অনলাইন প্রক্রিয়াটি এক রীতিমতো পরীক্ষার মতো। বিশেষত বয়স্ক নাগরিকদের কাছে এটি প্রায় অতিক্রম্য বাধা। ফলে “ডিজিটাল বিভাজন”-এর বাস্তবতা আবারও সামনে এসেছে।

প্রশ্ন উঠছে, প্রযুক্তি কি সকলের জন্য সমানভাবে সহজলভ্য? ২০০২ সালের পর রাজ্যে প্রথমবার এই নিবিড় সংশোধন হচ্ছে। অর্থাৎ দুই দশকেরও বেশি পুরোনো ভোটার তালিকা এখন মিলিয়ে দেখা হচ্ছে বর্তমান তথ্যের সঙ্গে। কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৩২ শতাংশ ভোটারের তথ্য পুরোনো তালিকার সঙ্গে মিলেছে, বাকিদের যাচাই চলছে। এই বিশাল ব্যবধানই দেখাচ্ছে সময়ের সঙ্গে সমাজ, জনবিন্যাস ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা কতটা বদলে গেছে। গ্রাম শহরে পরিণত হয়েছে, পরিবার ছোট হয়েছে, অভিবাসন বেড়েছে। ফলে পুরোনো তথ্যের সঙ্গে নতুন তথ্যের তুলনা করতে গিয়ে তৈরি হচ্ছে ভুল, বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তা। দুই দশকের ব্যবধান মানে কেবল সময় নয়। এটি রাজনীতি, জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও নাগরিক চেতনার পরিবর্তনের প্রতিফলন। প্রশাসন যদি তা বুঝতে ব্যর্থ হয়, তবে এই প্রক্রিয়া গণতান্ত্রিক নয়, বরং যান্ত্রিক হয়ে দাঁড়াবে।
কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী, যাঁদের তথ্য পুরোনো তালিকার সঙ্গে মেলে না, তাঁদের নথি যাচাই করতে হবে। কিন্তু এখানেই নতুন বিপত্তি। গ্রামীণ ও আর্থিকভাবে দুর্বল মানুষের কাছে জন্মসনদ, ঠিকানার প্রমাণ বা আধার কার্ডের মতো নথি সবসময় থাকে না। অনেক সময় ঠিকানা বদল, বিবাহ বা কর্মসূত্রে স্থানান্তরিত হওয়া ইত্যাদি কারণে মানুষ নিজেই নিজের প্রমাণপত্র জোগাড় করতে হিমশিম খান। ফলে অনেকেই আশঙ্কা করছেন তাঁদের নাম বাদ পড়তে পারে ভোটার তালিকা থেকে। যেখানে রাষ্ট্র নাগরিকের পরিচয় নিশ্চিত করার কথা, সেখানে নাগরিককেই নিজের অস্তিত্ব প্রমাণে দৌড়ঝাঁপ করতে হচ্ছে।

বিভিন্ন জেলার খবরে লক্ষ করেছি, BLO বা স্থানীয় কর্মীদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। কোথাও ফর্ম বিলি না করে ফেলে রাখা হয়েছে, কোথাও আবার রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ উঠছে। বিরোধীরা দাবি করছে এসআইআর প্রক্রিয়া প্রশাসনের নয়, বরং রাজনৈতিক পক্ষপাতের শিকার হচ্ছে। তৃণমূল কংগ্রেস ইতিমধ্যেই অভিযোগ তুলেছে যে, এসআইআর-এর নামে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে।‌ রেড রোড থেকে জোড়াসাঁকো পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় নেতৃত্ব দিয়েছেন বিশাল মিছিলে। তাঁদের বক্তব্য, এই প্রক্রিয়া নিরপেক্ষ নয়; এর আড়ালে ভোটার তালিকা থেকে নির্দিষ্ট শ্রেণিকে বাদ দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে। অন্যদিকে, বিজেপির একাংশের দাবি, রাজ্য প্রশাসন নিজেই কমিশনের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। ফলে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের এক নতুন রাজনৈতিক টানাপোড়েনও স্পষ্ট হচ্ছে। প্রশাসনের লক্ষ্য অবশ্যই তালিকার শুদ্ধতা বৃদ্ধি করা। কিন্তু বাস্তবে যদি সেই শুদ্ধতার দোহাই দিয়ে মানুষ বাদ পড়ে, তাহলে এই প্রচেষ্টা গণতন্ত্রের পরিপন্থী হয়ে দাঁড়ায়। নাগরিক পরিচয় যে রাষ্ট্রের দান নয়, সেটি এই সময় বারবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া জরুরি। একজন নাগরিকের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া মানে তাঁর সামাজিক মর্যাদা ও আত্মসম্মানের ওপর আঘাত। এসআইআর প্রক্রিয়া নিছক ভোটার তালিকা সংশোধনের উদ্যোগ নয়; এটি রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও নাগরিক আস্থার এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাক্ষেত্র। রাজনীতির কোলাহলের বাইরে, এই প্রক্রিয়াটি নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস পুনর্গঠনের সুযোগ এনে দিতে পারত। যদি প্রশাসন সেটিকে সহানুভূতি ও স্বচ্ছতার সঙ্গে পরিচালনা করত। নির্বাচন কমিশন যেহেতু সাংবিধানিক সংস্থা, তাই তার নিরপেক্ষতা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠছে। বিরোধীরা অভিযোগ করছে কেন্দ্রের হস্তক্ষেপে রাজ্যের কমিশন অফিসারদের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে কমিশন বলছে, রাজ্যের রাজনৈতিক দলগুলিই মাঠ পর্যায়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। এই পারস্পরিক অভিযোগের মধ্যে আসল প্রশ্নটা হারিয়ে যাচ্ছে।


আজকের এসআইআর প্রক্রিয়া আমাদের চোখে এক আয়না যেখানে প্রশাসনিক জটিলতা, রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং নাগরিক অনিশ্চয়তা একসঙ্গে প্রতিফলিত হচ্ছে। ভোটার তালিকার শুদ্ধতা যেমন দরকার, তেমনি প্রয়োজন নাগরিকের সম্মান, আস্থা ও অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা। গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি তালিকার নিখুঁততায় নয়, বরং মানুষের আস্থায়। তবে সবশেষে একটিই প্রশ্ন থেকে যায় — মানুষ কি তাঁর ভোটাধিকার নিয়ে নিরাপদ বোধ করছেন?

এছাড়াও পড়ুন ফোকাস বেঙ্গলে 




চাকা ঘোরে রথের, হৃদয় কি ঘোরে? উৎসব রইল রাস্তায়, ঈশ্বর চুপ অন্তরে

 
"চাকা ঘোরে রথের, হৃদয় কি ঘোরে?
 উৎসব রইল রাস্তায়, ঈশ্বর চুপ অন্তরে"

আমার মনে হয়, আজকের রথযাত্রা যেন দাঁড়িয়ে আছে দুটি পথের সন্ধিক্ষণে। একদিকে প্রযুক্তির দীপ্তি, যেখানে ঈশ্বরের পথে পা ফেলছি না, বরং ক্যামেরার ফোকাসে তাঁকে বন্দি করছি এবং অন্যদিকে বিশ্বাসের ধূসর স্নিগ্ধতা। ধর্ম ও রাজনীতির সীমারেখা ঘোলাটে। আর এসবের মধ্যে দাঁড়িয়ে আমরা- ভক্ত নই, পর্যবেক্ষক। আর রথের মতো শান্তি ও সমতার প্রতীক যদি হয়ে যায় দখলের প্রতিযোগিতা, তবে আমরা কেবল ঈশ্বরকে নয়, নিজের বিবেককেও বিসর্জন দিচ্ছি  — লিখেছেন দেবরাজ সাহা 


রথের চাকা ঘুরছে। বহমান, অনবরত। কিন্তু সেই গতির গভীরে আমরা কী শুনি? ভক্তির ধ্বনি, না এক বিবশ বিনোদনের ব্যস্ত শব্দ? এক সময় রথ মানে ছিল আকাশে মেঘ, জমির ধুলো, মানুষের ঢল আর অন্তরের আবেগ। কাঁধে বল, কপালে ঘাম, গলায় জয়ধ্বনি। আর আজ সেই কাঁধে ক্যামেরা ঝুলছে, সেলফি স্টিকে ঈশ্বর আটকে আছেন। ভক্তি এখন ‘লাইভ’এ। দর্শন নয়, সম্প্রচার। মন নয়, মোবাইল অন। আমার শৈশবে, রথ মানে ছিল কাগজে রং করে বানানো রথ। পাড়ার বুড়ো ঠাকুরমা বলতেন, “জগন্নাথ আজ রথে উঠেছেন, তোদের জীবনেও শুভ সূচনা হোক।” সেইসব কথা আজ আর শোনা যায় না। এখন শোনা যায়, “লাইভটা ঠিক মতো হচ্ছে তো?” অথবা, “ফলোয়ার বাড়ছে তো?” ঈশ্বর যেন সামাজিক মাধ্যমের একটি ফিচার হয়ে গিয়েছেন যিনি মানুষ নয়, কন্টেন্ট। একসময় রথ মানে ছিল আবেগ, বাড়ির ছোট্ট বেদিতে কাঠের রথে বসা ঠাকুরকে ভোগ দেওয়া,আর ঠাকুরমশাইয়ের মুখে শুনে আসা পদাবলী। আজ রথ মানে মেলা, শপিং, ঝলমলে ডিজে সাউন্ডে ঢেকে যাওয়া পুরোনো গান। রথ মানে 'সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা', যেখানে ঈশ্বরের নাম ডুবে যায় সাউন্ড মিক্সারে। 
আমার মতে, এটা আমাদের অন্তরের বিপর্যয়। ঈশ্বরকে আজ আমরা দেখাতে চাই, অনুভব করতে চাই না। আমরা তাঁর ছবি তুলতে চাই, সান্নিধ্যে থাকতে চাই না। আমরা রিল বানাই, কিন্তু রূপান্তর হই না। তবে প্রযুক্তির গরিমা আমি অস্বীকার করি না। এই প্রযুক্তিই আজ পৌঁছে দিচ্ছে রথের স্পর্শ সেই সব মানুষদের কাছে যারা শারীরিকভাবে বা ভৌগোলিকভাবে উপস্থিত থাকতে পারেন না। বৃদ্ধ, অসুস্থ, প্রবাসী তাঁরা অন্তত স্ক্রিনে দর্শন পান। কিন্তু প্রশ্ন থাকে দর্শন কি অনুভবের সমান? মায়ের কোলে ঘুমানোর যে উষ্ণতা, তা কি ফোনে দেখা মায়ের ছবিতে থাকে? ঠিক তেমনই, রথ যদি অনুভব না হয়, তাহলে তা নিছকই দৃশ্য, অনুভবহীন একটি দৃশ্য। 
আজকের ডিজিটাল রথের দৌলতে ফুটে উঠছে এক অস্বস্তিকর প্রতিচ্ছবি।একদিকে আলোকিত রথ, অন্যদিকে অন্ধকারে ঢেকে থাকা সমাজচেতনা। যখন রথের গায়ে রং-বেরঙের আলোকসজ্জা, তখন পাশের গ্রামে এক রোগী রক্তের অভাবে বা ডাক্তারের অভাবে মারা যাচ্ছেন। রথ মঞ্চে রাজনীতিকদের মুখ দেখা যায়, কিন্তু মানুষের চোখে নেই স্বস্তি। রাজনৈতিক নেতারা এসে বলছেন “ভগবানের আশীর্বাদে আজ আমরা এখানে”- কিন্তু প্রার্থনায় রাজনীতি ঢুকে গেলে তা আর প্রার্থনা থাকে না, হয়ে ওঠে প্রতারণা। রথের দিনে যখন ভক্তরা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন ভগবান দর্শন করবার জন্য, তখন মন্দিরের পাশে আলাদাভাবে থাকে VIP লাইন, তাছাড়াও ঠাকুরের চেয়েও বড় হয় ফ্লেক্সে ছাপানো রাজনীতিকের মুখ। এটাই আজকের সমাজের বাস্তব চিত্র। ধর্ম ও রাজনীতির সীমারেখা ঘোলাটে। ঈশ্বরের নামে মিছিল হয়, ট্রেন বন্ধ হয়, প্রাচীন রথকে ঘিরে শুরু হয় মেরুকরণ। রথ হয়ে ওঠে ক্ষমতা প্রদর্শনের অজুহাত।ধর্ম যখন রাজনীতির হাত ধরে চলে, তখন তা ভক্তির বাহন নয়, বিভেদের যন্ত্র হয়ে ওঠে। আর রথের মতো শান্তি ও সমতার প্রতীক যদি হয়ে যায় দখলের প্রতিযোগিতা, তবে আমরা কেবল ঈশ্বরকে নয়, নিজের বিবেককেও বিসর্জন দিচ্ছি। ধর্মের নামে উল্লাস আর ভোটের নামে হুজুগ; এই দুইয়ের মধ্যবর্তী রথে ঈশ্বর আর থাকেন না, থাকেন শুধু ব্যালটের সম্ভাবনা। 
আমি বিশ্বাস করি, ঈশ্বরকে সত্যিই অনুভব করতে হলে চোখ নয়, হৃদয় দরকার। আর সেই হৃদয় আজ যেন হারিয়ে যাচ্ছে ক্যামেরার লেন্সে। আমরা ঈশ্বরের পথের সঙ্গী হচ্ছি না, বরং তাঁকে পর্যবেক্ষণের বস্তুতে রূপান্তর করছি। তবু আমি বলব, প্রযুক্তির সবটুকু মন্দ নয়। এটা একটা আয়না। সে আমাদের দেখায় আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে। কিন্তু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমরা কি শুধুই মুখ ঠিক করি? না কি চোখে চোখ রেখে দেখি নিজের অন্তর? এই প্রশ্নই রথযাত্রার দিন আমাদের করা দরকার। আজ যখন আমরা ডিজিটাল ক্যামেরা হাতে রথ দেখতে যাই, তখন নিজেকেই জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয় রথের আসল দর্শনার্থী কে? আমি, না আমার মোবাইল ফোন? রথ মানে তো কেবল উল্লাস নয়। রথ মানে পথ। রথ মানে চলা। সেই চলার সাথী হওয়া মানে ঈশ্বরের কাছে পৌঁছানো নয়, বরং তাঁর মতো করে মানুষের পাশে দাঁড়ানো। যদি রথযাত্রা আমাদের শুধু বাহ্যিক উৎসবে সীমাবদ্ধ রাখে, তাহলে সেটি ধর্ম নয়, হুজুগ। আর যদি রথ আমাদের ভিতরের রথচক্র ঘোরাতে শেখায়—তাহলে সেই রথই সত্যিকারের উৎসব। আমার মনে হয়, আজ আমাদের ঈশ্বরকে দরকার নিজের ভেতরের রথে বসিয়ে তোলার। উৎসব শুধু রাস্তায় নয়, সে যেন ঘটে আত্মার আঙিনায়। যদি তা না হয়, তবে রথ থাকবে, কিন্তু যাত্রা হবে না। আর ঈশ্বরের এর চেয়ে দুঃখের কিছু নেই, যদি তাঁকে বসিয়ে রাখা হয় একা এক নিঃসঙ্গ রথে। প্রযুক্তি খুব ভালো, কিন্তু সে যেন ঈশ্বরের প্রতীক না হয়ে ওঠে। ঈশ্বর যিনি অনুভবের বস্তু, তাঁকে যদি আমরা শিখরে বসিয়ে রিল বানানোর অস্ত্র করে ফেলি, তাহলে তাঁকে আমরা খুইয়ে ফেলি। ঈশ্বর তখন আর আমাদের হৃদয়ে থাকেন না, থাকেন ট্রেন্ডিং ট্যাগে। 

আমার বিশ্বাস, ঈশ্বরের রথ যতটা না পথচলার প্রতীক, তার চেয়েও বেশি এক আত্মজাগরণের আহ্বান। রথ টানার শক্তি শুধু বাহুতে নয়, লাগে বিবেকেও। আর সেই বিবেক আজ যেন ক্রমেই মঞ্চ, মিডিয়া আর মিথ্যের ভিড়ে নিঃশব্দ হয়ে যাচ্ছে। আমি বলি, প্রযুক্তি থাকুক, জৌলুস থাকুক, তবু ঈশ্বর যেন অন্তরেই থাকেন। তাঁকে যেন আমরা ব্যবহার না করি, বরং উপলব্ধি করি। যদি আমরা সত্যিই চাই ঈশ্বরকে কাছে পাবার, তবে আমাদের হৃদয়টাও প্রস্তুত করতে হবে ভক্তির, বিনয়ের, প্রশ্নের এবং প্রতিরোধের মাটি দিয়ে। কারণ ঈশ্বর কেবল রথে বসেন না, তিনি বসেন সেই মনেও, যেখানে মানুষকে মানুষ ভাবার সাহস এখনও বেঁচে আছে। আর আমি সেই সাহসকেই ঈশ্বর বলে জানি।

তারিখ:- ২৭.০৬.২০২৫