"চাকা ঘোরে রথের, হৃদয় কি ঘোরে?
উৎসব রইল রাস্তায়, ঈশ্বর চুপ অন্তরে"
আমার মনে হয়, আজকের রথযাত্রা যেন দাঁড়িয়ে আছে দুটি পথের সন্ধিক্ষণে। একদিকে প্রযুক্তির দীপ্তি, যেখানে ঈশ্বরের পথে পা ফেলছি না, বরং ক্যামেরার ফোকাসে তাঁকে বন্দি করছি এবং অন্যদিকে বিশ্বাসের ধূসর স্নিগ্ধতা। ধর্ম ও রাজনীতির সীমারেখা ঘোলাটে। আর এসবের মধ্যে দাঁড়িয়ে আমরা- ভক্ত নই, পর্যবেক্ষক। আর রথের মতো শান্তি ও সমতার প্রতীক যদি হয়ে যায় দখলের প্রতিযোগিতা, তবে আমরা কেবল ঈশ্বরকে নয়, নিজের বিবেককেও বিসর্জন দিচ্ছি — লিখেছেন দেবরাজ সাহা
রথের চাকা ঘুরছে। বহমান, অনবরত। কিন্তু সেই গতির গভীরে আমরা কী শুনি? ভক্তির ধ্বনি, না এক বিবশ বিনোদনের ব্যস্ত শব্দ? এক সময় রথ মানে ছিল আকাশে মেঘ, জমির ধুলো, মানুষের ঢল আর অন্তরের আবেগ। কাঁধে বল, কপালে ঘাম, গলায় জয়ধ্বনি। আর আজ সেই কাঁধে ক্যামেরা ঝুলছে, সেলফি স্টিকে ঈশ্বর আটকে আছেন। ভক্তি এখন ‘লাইভ’এ। দর্শন নয়, সম্প্রচার। মন নয়, মোবাইল অন। আমার শৈশবে, রথ মানে ছিল কাগজে রং করে বানানো রথ। পাড়ার বুড়ো ঠাকুরমা বলতেন, “জগন্নাথ আজ রথে উঠেছেন, তোদের জীবনেও শুভ সূচনা হোক।” সেইসব কথা আজ আর শোনা যায় না। এখন শোনা যায়, “লাইভটা ঠিক মতো হচ্ছে তো?” অথবা, “ফলোয়ার বাড়ছে তো?” ঈশ্বর যেন সামাজিক মাধ্যমের একটি ফিচার হয়ে গিয়েছেন যিনি মানুষ নয়, কন্টেন্ট। একসময় রথ মানে ছিল আবেগ, বাড়ির ছোট্ট বেদিতে কাঠের রথে বসা ঠাকুরকে ভোগ দেওয়া,আর ঠাকুরমশাইয়ের মুখে শুনে আসা পদাবলী। আজ রথ মানে মেলা, শপিং, ঝলমলে ডিজে সাউন্ডে ঢেকে যাওয়া পুরোনো গান। রথ মানে 'সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা', যেখানে ঈশ্বরের নাম ডুবে যায় সাউন্ড মিক্সারে।
আমার মতে, এটা আমাদের অন্তরের বিপর্যয়। ঈশ্বরকে আজ আমরা দেখাতে চাই, অনুভব করতে চাই না। আমরা তাঁর ছবি তুলতে চাই, সান্নিধ্যে থাকতে চাই না। আমরা রিল বানাই, কিন্তু রূপান্তর হই না। তবে প্রযুক্তির গরিমা আমি অস্বীকার করি না। এই প্রযুক্তিই আজ পৌঁছে দিচ্ছে রথের স্পর্শ সেই সব মানুষদের কাছে যারা শারীরিকভাবে বা ভৌগোলিকভাবে উপস্থিত থাকতে পারেন না। বৃদ্ধ, অসুস্থ, প্রবাসী তাঁরা অন্তত স্ক্রিনে দর্শন পান। কিন্তু প্রশ্ন থাকে দর্শন কি অনুভবের সমান? মায়ের কোলে ঘুমানোর যে উষ্ণতা, তা কি ফোনে দেখা মায়ের ছবিতে থাকে? ঠিক তেমনই, রথ যদি অনুভব না হয়, তাহলে তা নিছকই দৃশ্য, অনুভবহীন একটি দৃশ্য।
আজকের ডিজিটাল রথের দৌলতে ফুটে উঠছে এক অস্বস্তিকর প্রতিচ্ছবি।একদিকে আলোকিত রথ, অন্যদিকে অন্ধকারে ঢেকে থাকা সমাজচেতনা। যখন রথের গায়ে রং-বেরঙের আলোকসজ্জা, তখন পাশের গ্রামে এক রোগী রক্তের অভাবে বা ডাক্তারের অভাবে মারা যাচ্ছেন। রথ মঞ্চে রাজনীতিকদের মুখ দেখা যায়, কিন্তু মানুষের চোখে নেই স্বস্তি। রাজনৈতিক নেতারা এসে বলছেন “ভগবানের আশীর্বাদে আজ আমরা এখানে”- কিন্তু প্রার্থনায় রাজনীতি ঢুকে গেলে তা আর প্রার্থনা থাকে না, হয়ে ওঠে প্রতারণা। রথের দিনে যখন ভক্তরা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন ভগবান দর্শন করবার জন্য, তখন মন্দিরের পাশে আলাদাভাবে থাকে VIP লাইন, তাছাড়াও ঠাকুরের চেয়েও বড় হয় ফ্লেক্সে ছাপানো রাজনীতিকের মুখ। এটাই আজকের সমাজের বাস্তব চিত্র। ধর্ম ও রাজনীতির সীমারেখা ঘোলাটে। ঈশ্বরের নামে মিছিল হয়, ট্রেন বন্ধ হয়, প্রাচীন রথকে ঘিরে শুরু হয় মেরুকরণ। রথ হয়ে ওঠে ক্ষমতা প্রদর্শনের অজুহাত।ধর্ম যখন রাজনীতির হাত ধরে চলে, তখন তা ভক্তির বাহন নয়, বিভেদের যন্ত্র হয়ে ওঠে। আর রথের মতো শান্তি ও সমতার প্রতীক যদি হয়ে যায় দখলের প্রতিযোগিতা, তবে আমরা কেবল ঈশ্বরকে নয়, নিজের বিবেককেও বিসর্জন দিচ্ছি। ধর্মের নামে উল্লাস আর ভোটের নামে হুজুগ; এই দুইয়ের মধ্যবর্তী রথে ঈশ্বর আর থাকেন না, থাকেন শুধু ব্যালটের সম্ভাবনা।
আমি বিশ্বাস করি, ঈশ্বরকে সত্যিই অনুভব করতে হলে চোখ নয়, হৃদয় দরকার। আর সেই হৃদয় আজ যেন হারিয়ে যাচ্ছে ক্যামেরার লেন্সে। আমরা ঈশ্বরের পথের সঙ্গী হচ্ছি না, বরং তাঁকে পর্যবেক্ষণের বস্তুতে রূপান্তর করছি। তবু আমি বলব, প্রযুক্তির সবটুকু মন্দ নয়। এটা একটা আয়না। সে আমাদের দেখায় আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে। কিন্তু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমরা কি শুধুই মুখ ঠিক করি? না কি চোখে চোখ রেখে দেখি নিজের অন্তর? এই প্রশ্নই রথযাত্রার দিন আমাদের করা দরকার। আজ যখন আমরা ডিজিটাল ক্যামেরা হাতে রথ দেখতে যাই, তখন নিজেকেই জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয় রথের আসল দর্শনার্থী কে? আমি, না আমার মোবাইল ফোন? রথ মানে তো কেবল উল্লাস নয়। রথ মানে পথ। রথ মানে চলা। সেই চলার সাথী হওয়া মানে ঈশ্বরের কাছে পৌঁছানো নয়, বরং তাঁর মতো করে মানুষের পাশে দাঁড়ানো। যদি রথযাত্রা আমাদের শুধু বাহ্যিক উৎসবে সীমাবদ্ধ রাখে, তাহলে সেটি ধর্ম নয়, হুজুগ। আর যদি রথ আমাদের ভিতরের রথচক্র ঘোরাতে শেখায়—তাহলে সেই রথই সত্যিকারের উৎসব। আমার মনে হয়, আজ আমাদের ঈশ্বরকে দরকার নিজের ভেতরের রথে বসিয়ে তোলার। উৎসব শুধু রাস্তায় নয়, সে যেন ঘটে আত্মার আঙিনায়। যদি তা না হয়, তবে রথ থাকবে, কিন্তু যাত্রা হবে না। আর ঈশ্বরের এর চেয়ে দুঃখের কিছু নেই, যদি তাঁকে বসিয়ে রাখা হয় একা এক নিঃসঙ্গ রথে। প্রযুক্তি খুব ভালো, কিন্তু সে যেন ঈশ্বরের প্রতীক না হয়ে ওঠে। ঈশ্বর যিনি অনুভবের বস্তু, তাঁকে যদি আমরা শিখরে বসিয়ে রিল বানানোর অস্ত্র করে ফেলি, তাহলে তাঁকে আমরা খুইয়ে ফেলি। ঈশ্বর তখন আর আমাদের হৃদয়ে থাকেন না, থাকেন ট্রেন্ডিং ট্যাগে।
আমার বিশ্বাস, ঈশ্বরের রথ যতটা না পথচলার প্রতীক, তার চেয়েও বেশি এক আত্মজাগরণের আহ্বান। রথ টানার শক্তি শুধু বাহুতে নয়, লাগে বিবেকেও। আর সেই বিবেক আজ যেন ক্রমেই মঞ্চ, মিডিয়া আর মিথ্যের ভিড়ে নিঃশব্দ হয়ে যাচ্ছে। আমি বলি, প্রযুক্তি থাকুক, জৌলুস থাকুক, তবু ঈশ্বর যেন অন্তরেই থাকেন। তাঁকে যেন আমরা ব্যবহার না করি, বরং উপলব্ধি করি। যদি আমরা সত্যিই চাই ঈশ্বরকে কাছে পাবার, তবে আমাদের হৃদয়টাও প্রস্তুত করতে হবে ভক্তির, বিনয়ের, প্রশ্নের এবং প্রতিরোধের মাটি দিয়ে। কারণ ঈশ্বর কেবল রথে বসেন না, তিনি বসেন সেই মনেও, যেখানে মানুষকে মানুষ ভাবার সাহস এখনও বেঁচে আছে। আর আমি সেই সাহসকেই ঈশ্বর বলে জানি।
তারিখ:- ২৭.০৬.২০২৫
Fantastic writing ; but some area are there wherein concept is not clearly clear such as the locations of God ( vogoman ) , God doesn't need of our food staffs but we need God's production of etc.
ReplyDeleteYou're absolutely right .Thank you for your thoughtful observation. God is present everywhere: in the air we breathe, the earth we walk on, and the people we meet. The idol or the temple is just a symbol to help our limited human minds focus. The real divinity is all-pervading and formless. The act of "feeding God" is not for God’s sustenance, but for our own spiritual growth , to learn to be thankful, to recognize our dependence, and to connect with something higher than ourselves.
ReplyDeleteভালো লেখা। বর্তমানে এখন এটাই বেশি হচ্ছে দেখছি
ReplyDeleteJAY JAGANNATH
ReplyDeleteJay Jagannath
ReplyDeleteGive Me your Contact Number Debraj
ReplyDeleteবেশ ভালো লিখেছেন আপনি। ফেসবুকের মাধ্যমে পেলাম। বর্তমান সমাজের এক সম্পূর্ন চিত্র আপনি তুলে ধরেছেন। আরো আরো লিখুন।
ReplyDelete