রাত তখন প্রায় বারোটা ছুঁইছুঁই।
গ্রামের উপর নেমে এসেছে এক অদ্ভুত নীরবতা। দূরে বাঁশঝাড়ের ফাঁক দিয়ে হাওয়া বইছে “সসসস…” শব্দ তুলে। কোথাও এক-আধটা কুকুর অলস ভঙ্গিতে ডেকে উঠছে, আর পুকুরপাড়ে ব্যাঙেরা যেন গম্ভীর সভা বসিয়েছে।
ঠিক সেই সময় জমিদারবাড়ির পেছন দিক থেকে ভেসে এলো এক বিকট শব্দ—
“ঢপাস!”
শব্দটা এমন, যেন আকাশ থেকে কেউ একটা হাতি ছুড়ে ফেলেছে। চৌকিদার নিতাই তখন উঠোনের কোণে বসে আধঘুমে বিড়ি ধরিয়েছিল। শব্দ শুনে সে এমন লাফ দিল যে নিজের লুঙ্গিতেই প্রায় পা জড়িয়ে যাচ্ছিল।
— “ওরে বাবা! এ তো নিশ্চিত চোরের শব্দ!”
লাঠি হাতে ছুটতে ছুটতে সে চেঁচিয়ে উঠল—
“ওরে কে কোথায় আছিস! জমিদারবাড়িতে ডাকাত পড়েছে রে!”
মুহূর্তের মধ্যে গোটা গ্রাম জেগে উঠল। কারও হাতে লণ্ঠন, কারও হাতে বাঁশ, কেউ আবার তাড়াহুড়োয় বউয়ের ঝাঁটা নিয়েই বেরিয়ে এসেছে। এক বুড়ো তো উত্তেজনায় নিজের হাঁটার লাঠির বদলে শাবল নিয়ে এসেছে।
সবাই গিয়ে দেখে কাঁঠালগাছের নিচে এক লোক চিৎপটাং হয়ে পড়ে আছে। মাথা থেকে পা পর্যন্ত কাঁঠালের আঠা, চুলে শুকনো পাতা, আর মুখে এমন কষ্টের ছাপ যেন তাকে একসাথে অঙ্ক, সংস্কৃত আর শ্বশুরবাড়ির প্রশ্নের উত্তর দিতে বলা হয়েছে।
নিতাই লাঠি ঠুকঠুক করে বলল—
“ব্যাটা! কে তুই?”
লোকটা ধীরে ধীরে উঠে বসল। তারপর বুক ফুলিয়ে এমন গলায় বলল, যেন কলকাতার সাহিত্য সভায় এসেছে—
“আমি… চোর নই। আমি কবি।”
এক মুহূর্ত নিস্তব্ধতা। তারপর ভিড়ের পেছন থেকে হারাধন বলে উঠল—
“তা হলে নিশ্চয়ই কাঁঠালগুলো ছন্দ মিলিয়ে পাড়ছিল!”
চারদিকে হাসির রোল পড়ে গেল। জমিদারমশাই ততক্ষণে এসে গম্ভীর মুখে চেয়ারে বসেছেন। তাঁর বিশাল গোঁফ দেখে গ্রামের ছেলেপুলেরা পর্যন্ত ভয় পায়। তিনি চোখ কুঁচকে বললেন—
“তা কবিমশাই, মাঝরাতে গাছে উঠে কাব্যচর্চা করছিলে নাকি?”
লোকটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল—
“আজ পূর্ণিমা… বাতাসে পাকা কাঁঠালের গন্ধ… চারদিকে নিস্তব্ধতা… এমন রাতে মানুষের হৃদয়ে কবিতা জেগে ওঠে জমিদারমশাই।”
নিতাই বলল—
“তা কবিতা জাগলে গাছে উঠতে হয়?”
লোকটা চোখ বন্ধ করে উত্তর দিল—
“উচ্চতায় না উঠলে উচ্চ ভাব আসে না।”
এক বুড়ো সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল—
“বাপরে! এ তো দেখি বিএ পাশ চোর!”
আবার হাসির দমক উঠল। জমিদার এবার একটু রেগে বললেন—
“তা হলে পড়ে গেলি কেন?”
লোকটা বুক টিপে গম্ভীর গলায় বলল—
“কবিতা আর বাস্তবতার ভারসাম্য রাখতে পারিনি…”
এই কথা শুনে পাশের গরু পর্যন্ত “হাম্বা” করে উঠল।
মনে হলো সেও হাসি চেপে রাখতে পারছে না।
ঠিক তখন জমিদারের ছোট ছেলে দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল—
“বাবা! বাবা! ওর পকেটে তিনটে কাঁঠালের কোয়া পেয়েছি!”
সবাই “ওওও!” করে উঠল।
জমিদার গম্ভীর হয়ে বললেন—
“এবার বল! ওগুলো কেন?”
লোকটা শান্ত গলায় বলল—
“প্রমাণ।”
“কিসের প্রমাণ?”
“কাঁঠালটি সত্যিই পেকেছিল।”
নিতাই এত জোরে হেসে উঠল যে হাতে থাকা লাঠিটা মাটিতে ঠুকে নিজেই ভেঙে ফেলল। এরই মাঝে গ্রামের মাতব্বর গদাধর বললেন—
“আমার মনে হয় এ লোককে থানায় না পাঠিয়ে যাত্রাদলে পাঠানো উচিত।”
পাশ থেকে কেউ বলল—
“না না, যাত্রাদল কেন? এ তো ভোটে দাঁড়ালেই জিতবে!”
একজন আবার বলল—
“চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে যে এত সুন্দর ভাষণ দিতে পারে, সে বড় নেতা হবেই!”
এবার জমিদারবাবু একটু মজা পেতে শুরু করেছেন। তিনি হেসে বললেন—
“আচ্ছা, শেষবার জিজ্ঞেস করছি… গাছে উঠলি কীভাবে?”
লোকটা গর্বিত মুখে বলল—
“সাহস দিয়ে।”
— “আর নামলি?”
লোকটা আকাশের দিকে তাকাল। তারপর অত্যন্ত বিষণ্ন গলায় বলল—
“মাধ্যাকর্ষণ শক্তি দিয়ে…”
এই কথা শুনে পুরো উঠোন ফেটে পড়ল হাসিতে।
কেউ হাঁটু চাপড়াচ্ছে, কেউ মাটিতে বসে গড়াগড়ি খাচ্ছে।
এক বুড়ি তো হাসতে হাসতে বলেই ফেলল—
“হায় গো! এমন চোর যদি রোজ আসে, তা হলে বিনা টিকিটে নাটক দেখা যাবে!”
ঠিক তখন পাশের বাড়ির গণেশ হঠাৎ বলে উঠল—
“এক মিনিট! এ লোকটাকে আমি চিনি!”
সবাই চুপ।
“গত মাসে আমাদের আমগাছ থেকেও আম পাড়তে গিয়ে ধরা পড়েছিল। তখন নিজেকে বলেছিল ‘ফলতত্ত্ব গবেষক’!”
লোকটা একটু লজ্জা পেয়ে বলল—
“গবেষণার কাজ করতেই হয়…”
জমিদার এবার হেসে কুটোপাটি। তিনি বললেন—
“আচ্ছা কবিমশাই, একটা কবিতা শুনিয়ে যান দেখি।”
লোকটা গলা খাঁকারি দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে আবৃত্তি শুরু করল—
“কাঁঠালের ডাকে এলাম রাতে, জেগে ছিল চন্দ্র,
কবিতা খুঁজতে গাছে উঠি, ভুলে ভালো-মন্দ।
ডাল ভেঙে যে পড়লাম শেষে, সবার চোখের সামনে—
চোর নই গো, কাব্যই আমাকে ডুবিয়েছে বদনামে!”
শেষে জমিদার হেসে বললেন—
“যাও, আজ তোমাকে ছেড়ে দিলাম। তবে আবার যদি কবিতা লিখতে ইচ্ছে করে, কাগজে লিখবে… গাছে উঠে নয়!”
লোকটা হাত জোড় করে বলল—
“কবির প্রতিজ্ঞা রইল।”
নিতাই পাশে দাঁড়িয়ে বিড়ি বার করতে করতে বলল—
“হুঁ… পরেরবার নিশ্চয়ই লিচুকবি হয়ে আসবে!”
সেই রাতের পর থেকে লোকটার আসল নাম কেউ আর মনে রাখেনি। গ্রামের ছোট থেকে বড় সবাই তাকে এক নামেই ডাকত—
*“কাঁঠাল কবি”*
No comments:
Post a Comment