ছোট থেকেই সংসারের ভারটা কাঁধে তুলে নিয়েছে সে। বন্ধুরা যখন মাঠে দৌড়াত, মাঠে খেলাধুলা করতো, পাড়ার ঠেকে আড্ডা মারত, আর সে তখন ক্যালকুলেটর হাতে নিয়ে হিসেব করত যে মাসের শেষে কতগুলো টিউশন বাড়ি পেলে ভাত-ডালটা নিশ্চিন্তে জুটবে। দুপুরে ইউনিভার্সিটির ক্লাস শেষ করে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে ছুটে যায় একটার পর একটা বাড়িতে।
কারও মা বলে, “ওর ইংরেজিটা একটু দুর্বল,”
কেউ বলে, “অঙ্কটা ভালো করে দেখিয়ে দিও।”
তবু মাসের শেষে দৃশ্যটা একই।
দরজার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁপা গলায় বলে—“এই মাসের টাকাটা যদি…”
বাকিটা মুখে আনে না। গলায় আটকে যায় শব্দ।
তারপর একরাশ হাসি দিয়ে বলে, “থাক, পরে দিলেও হবে।”
সে দেখে তাদের সামনের ঘরে টিভি চলছে, গন্ধ উঠছে সদ্য রান্না করা খাবারের, কিন্তু তার হাতে তখন কেবল একটি পেন, ব্যাগ আর ছেঁড়া একটা কাগজের খাতা। বাড়ি ফিরে আলো-আঁধারিতে খাতার পাতা খোলে সে। অঙ্কগুলো ঠিকঠাক মিলছে, কিন্তু জীবনের অঙ্কটা কিছুতেই মিলছে না। টেবিলের পাশে রাখা চায়ের কাপটা ঠান্ডা হয়ে যায়, তবুও সে খাতার দিকে তাকিয়ে বসে থাকে, আর মাথায় হাজার চিন্তা।
সে মনে মনে ভাবে "কাল আবার যাব"।
কারণ তার না গেলে যে সংসারটা থেমে যাবে। মা-বাবার ওষুধ, বোনের টিফিন, নিজের বই এসবই যে সেই টিউশন টাকাটার ওপরেই দাঁড়িয়ে আছে।
রাতে আলো নিভে গেলে একা বসে থাকে সে। ঘরের কোণে বাতাসও তখন ভারী হয়ে ওঠে। কখনও ভাবে, যাদের সে পড়ায়, তারা একদিন বড় হবে, সফল হবে, হয়তো বিদেশেও যাবে। তাদের সার্টিফিকেটে থাকবে স্বপ্নের সই, কিন্তু এই মানুষটার নামটা কোথাও থাকবে না। তবু পরদিন সকাল হলে সে আবার ব্যাগটা তুলে নেয়।
হাসিমুখে বলে, “চল, আজ ইংরেজিতে Tense টা শেখাই।”
কারণ সে জানে পড়ানোই তার একমাত্র শান্তি, যেখানে যত দুঃখই থাক, বোর্ডে চক তুলে নিলেই সব দুঃখ-কষ্ট কোথায় যেন মিলিয়ে যায়।
হ্যাঁ, সেই টিউশন মাস্টার টা—
যার জীবন মানে পরের ভবিষ্যতের জন্য নিজের বর্তমানকে হারিয়ে ফেলা। তবু মুখে হাসি থাকে, চোখে থাকে নীরব জলের ঝিলিক। কারণ সে জানে এই হাসিটাই তাদের শেষ সম্বল। আর হয়তো সেই হাসিটাই একদিন হয়ে উঠবে তার সবচেয়ে বড় জয়।
No comments:
Post a Comment