লেখক :- দেবরাজ সাহা
ছেলেটির নাম মৈনাক, মেয়েটি অন্বেষা।
তিন নম্বর বাসে রোজ একসঙ্গে স্কুলে যাওয়া, একই টিউশনে বসে মাথা গোঁজার নাম করে চোখাচোখি, আর সন্ধ্যেবেলায় বাড়ির পাশে কুমোরটুলির গলিতে দাঁড়িয়ে থাকা—এই ছিল ওদের প্রেমের সবটা পৃথিবী।
অন্বেষা খুব হাসত, মৈনাক বলত, “তোর হাসিটাই আমার প্রিয় ঋতু।”
একদিন, এক শীতে, মৈনাক চুপচাপ হাতে একটা ছোট ফুল এনে বলেছিল,
“তুই চুলে পরবি এটা?”
অন্বেষা একটু লাজুক হয়ে বলেছিল,
“সবাই দেখবে তো…”
মৈনাক বলেছিল,
“তাহলে চোখ বন্ধ কর, আমি গুঁজে দিচ্ছি।”
ছবিটা সেই মুহূর্তের। সেই এক চিলতে স্বপ্নের।
এর কিছুদিন পরেই মৈনাক এর মা মারা যায়। আর্থিক চাপ, সংসারের হাল ধরতে সে আর কলেজে ভর্তি হতে পারেনি। সব শেষে একটা ফার্মেসিতে কাজ নেয়।
অন্বেষা ডাক্তারি পরীক্ষায় পাশ করে, কলকাতা চলে যায়।
সেই যে গেল, আর ফিরল কই?
মেসেঞ্জারে কিছুদিন যোগাযোগ ছিল। তারপর ধীরে ধীরে উত্তর আসা বন্ধ। মৈনাক বুঝে গিয়েছিল—অন্বেষার জীবনের গতি অনেক দূরে চলে গেছে।
কিন্তু মৈনাক কখনোই রাগ করেনি। কষ্টও হয়নি খুব একটা। শুধু মাঝে মাঝে কুমোরটুলির গলি দিয়ে গেলে একটু থেমে দাঁড়ায়।
একদিন বন্ধুকে বলেছিল,
“জানিস, ও একদিন বলেছিল—‘তুই একটা ফুল গুঁজে দিলে আমি চিরকাল সেটা রেখে দেব’।”
বন্ধু অবাক হয়ে বলেছিল,
“তুই তো জানিস, এখন ওর বিয়ের কথা চলছে, ও তো তোকে ভুলেই গেছে।”
মৈনাক মাথা নিচু করে হেসেছিল। বলেছিল,
“আমার কাছে ভালোবাসা মানে ওর মনে থাকা নয়,
ভালোবাসা মানে—ওর মাথায় এখনো একটা ফুল গোঁজা আছে কি না, সেটা ভাববার সুযোগ রাখা।”
অনেক বছর পর কলকাতার এক মেডিকেল কনফারেন্সে অন্বেষা দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিচ্ছিল। ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ চোখে পড়ল একটা চেনা মুখ—পিছন সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা এক যুবক, সাধারণ পোশাকে, মুখে সেই পুরনো হাসি।
অন্বেষার চোখ ভিজে গিয়েছিল। বক্তৃতা শেষ করে ছুটে গিয়েছিল।
কিন্তু মৈনাক তখন আর নেই।
শুধু চেয়ারটায় রাখা ছিল একটা খাম।
তার ভিতরে লেখা—
"তুই একদিন বলেছিলি, ‘একটু দাঁড়িয়ে যাবি?’
আমি দাঁড়িয়ে গেছিলাম।
আজ যাচ্ছি।
তোর পথ অনেক বড়, আমার পথ এখানেই ফুরোল।
শুভ হোক তোর জীবন,
—মৈনাক”
অন্বেষা সেদিন বুঝেছিল—সব ভালোবাসার গল্প বিয়েতে শেষ হয় না। কিছু গল্প কেবল এক মুহূর্তে জন্মায়, আর চিরকাল একটা গলির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকে।
শুধু একটিবার দেখা হয়ে গেলে... হয়তো সবটাই বদলে যেত।
শেষ নয়, কখনও শেষ হয় না। কিছু ভালোবাসা স্রেফ বেঁচে থাকে… এক মুহূর্তের মতো। একটা ফুলের মতো। “একটু দাঁড়িয়ে যাবি?” এই প্রশ্নের মতো।
No comments:
Post a Comment