ভোরবেলা থেকেই বৃষ্টি পড়ছে ঝিরঝির করে। চারপাশে জমে উঠেছে ঠান্ডা, ভেজা একটা গন্ধ। পল্টুর মা তখন রান্নাঘরে কাঁচা লঙ্কা বাটা আর পেঁয়াজ কুচোতে ব্যস্ত। হঠাৎই বাইরে থেকে পল্টু চিৎকার করে উঠলো—
— “মাআআ! ও মাআআ!”
পল্টুর মা অবাক হয়ে মাথা বের করলেন দরজার ফাঁক দিয়ে।
— “কী রে! এত আনন্দের কী হল? লাফাচ্ছিস কেন?”
পল্টু বলল — “মা! কাগজে পুজোবার্ষিকীর বিজ্ঞাপন বেরিয়েছে... বুঝলে ? আসছে মা! সে আসছে! দুর্গা, কাশফুল, আর... আর আনন্দমেলা'র গোয়েন্দা কাহিনি!”
মা একটু হাসলেন, “তা এত আনন্দের কি আছে বাপু ? যেন কি না কি বেরিয়েছে!”
পল্টু— “মা! তুমি বুঝবে না। এই বিজ্ঞাপন মানেই যেন আকাশে ঢাকের শব্দ শোনা যাচ্ছে! এটা একরকম ইশারা—পুজো আসছে! এর চেয়ে বড় সুখ কিছু হয়?”
মা বললেন— “তা বলছিস তো বেশ, আগে স্কুলের হোমওয়ার্ক শেষ কর!”
পল্টু গম্ভীর মুখে বলল— “এই পুজোবার্ষিকীর কাগজটা তো পাঠ্যবইয়েরই একটা অংশ মা! সাহিত্য না পড়লে পরীক্ষা কেমন করে দেব?”
মা মুখে চাপা হাসি চাপতে না পেরে বললেন— “তা হলে সুনীল এর লেখা পড়েই তুই গণিতে ৮৮ পেলি বুঝি?”
পল্টু ঠোঁট কুঁচকে বলল— “সেইটা তো... অন্য বিষয়! ওসব মার্কসের জন্য, আর এটা মন খুশি করার জন্য। দুই আলাদা মা!”
পল্টুর মা জবাব দিল— “তাই নাকি? ওই সুনীল তো গতবারেও ‘শেষ বেলায় রহস্য’ লেখার পর বলেছিলেন, আর লিখবেন না। এবার আবার এলেন? উনি তো দেখি পেন রেখে উঠে দাঁড়ালেও, আবার বসে পড়েন!”
পল্টু নাক সিঁটকে বলল— “বুদ্ধিহীন প্রজন্ম! পুজো মানেই গোয়েন্দা গল্প। আর সুনীল আবার কি কথা? এমন ভাব করছো যেন তোমার বন্ধু। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলো। আর তাঁর নতুন গল্প একবারই আসে বছরে! ওসব তুমি বুঝবে না।"
মা বলল— “হা! হা! হা! , বেশ তুই সব বুঝিস। তা হলে আগে সাহিত্যের মতো মুখ গম্ভীর করে বই পড়, আর আমি লুচির বদলে তোর জন্য একটা সাহিত্যমূলক রুটি বানাচ্ছি। নাম হবে—‘আলুভাজা ইন দ্য রেইন’।”
পল্টু চিৎকার করে উঠল— “চুপ করো মা ! সাহিত্য নিয়ে কটাক্ষ করো না! এবার আর সহ্য করব না!”
ওদিকে জানলার বাইরে বৃষ্টি ঝরছে টুপটাপ... আর ঘরের ভিতরে একটুকরো শারদ হাওয়া নেমে এসেছে খবরের কাগজের পাতার ফাঁক দিয়ে।
পুজো মানেই শুধু ঠাকুর দেখা নয় —
পুজো মানে “আসছে পুজোবার্ষিকী”র সেই শিরোনামটা দেখা, পৃষ্ঠার গন্ধ শুঁকে প্রথম গল্পটা কোন লেখকের তা দেখে নেওয়া, আর মা-সন্তানের খুনসুটি, আর লুচির গন্ধে ঘেরা ভোরবেলা।
.
.
.
.
কী তাই তো...?
No comments:
Post a Comment