Featured post

বর্ষা -বিষাদ

নিবিড় মেঘের নীলিমাতে কার বিষাদের স্বাক্ষর,  বৃষ্টিধারা পড়ে যেন নীরবতারই অক্ষর।  সাঁঝের আলো ধূপের ধোঁয়ায় জড়ায় ক্লান্ত বেলা,  অভিমানের অ...

বর্ষা -বিষাদ

নিবিড় মেঘের নীলিমাতে কার বিষাদের স্বাক্ষর, 
বৃষ্টিধারা পড়ে যেন নীরবতারই অক্ষর। 
সাঁঝের আলো ধূপের ধোঁয়ায় জড়ায় ক্লান্ত বেলা, 
অভিমানের অরণ্যে আজ শুধুই স্মৃতির খেলা। 
কদমডালে জলের নূপুর গোপন সুরে বাজে, 
 মনখারাপের ঋতু নেমে আসে বেলাশেষে।
ভেজা হাওয়া ছুঁয়ে যায় যে অনামিকা বন, 
সেখানেই তো জন্ম নেয় নির্বাক বিষণ্ন মন। 
দিগন্তজোড়া মেঘের আঁচল নত নদীর পারে, 
কে যেন আজ ব্যথার প্রদীপ জ্বেলে রাখে দ্বারে। 
জলরঙে আঁকা আকাশ জুড়ে অচেনা সব ছবি, 
অশ্রুর চেয়ে গভীর নাকি বর্ষাকালেরই কবি। 
তবু মনে হয়, প্রতিটি মেঘ একদিন যাবে সরে,
নতুন রোদই ফুটবে আবার এই জীবনের দ্বারে।
জলরেখারাই জানে শুধু নীরবতার ব্যাকরণ,
অব্যক্ত সব আর্তনাদের নামই জীবন।

লহ প্রণাম

শব্দের দীপ জ্বেলে এলে, জাগালে দেশের প্রাণ,
কলম হাতে লিখে গেলে স্বাধীনতার গান।to  
বন্দেমাতরম্ ধ্বনিতে আজও কাঁপে আকাশ-বাতাস,
তোমার বাণী জাগায় মনে অমর বিশ্বাস।
শব্দগুলো শুধুই শব্দ নয় , ছিল অগ্নির শিখা, 
তোমার হাতেই হয়েছিল স্বাধীনতার দীক্ষা। 
বাংলা ভাষার গৌরব তুমি, সাহিত্যের শিখর, 
যতদিন এই বাংলা বাঁচে, ততদিন তুমি অমর।
প্রজন্ম আসে, প্রজন্ম যায়, বদলায় কালের রথ, 
বঙ্কিম তুমি চিরঅক্ষয়, অনন্ত তোমার পথ। 
নবজাগরণের প্রথম আলো, বাংলার গর্ব তুমি, 
তোমার নামে আজও জাগে এই মাতৃভূমি। 
যুগ বদলায়, সময় বদলায়, বদলায় পৃথিবী,
বঙ্কিম তুমি চিরসবুজ, চিরনবীন কবি। 
আজও এই বাংলার প্রতিটি হৃদয়ে বাজে তোমার নাম,
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়— লহ প্রণাম। 

বাবা

যতবারই হোঁচট খাই, বাড়িয়ে দাও হাত, 
তোমার ছায়ায় ছোট্ট জীবন পায় নতুন প্রভাত। 
নিজের ইচ্ছে দূরে সরিয়ে গড়ো আমার পথ, 
তোমার ঘামে লেখা থাকে শতসহস্র শপথ। 
রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, করো জীবন জয়, 
তোমার ত্যাগের কাছে বাবা, পৃথিবী নত হয়। 
বাবা মানে, শক্ত হাত, নির্ভয়ের আশ্রয়, 
বাবা মানে, জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়। 
তোমার নীরব ত্যাগের কাছে শব্দ হয় ক্ষীণ, 
বাবা তুমি আছো বলেই জীবন এত রঙিন। 
জীবন যত দূরে যাক, যতই বদলাক দিন, 
বাবার মতো আশ্রয় আর হয় না কোনোদিন।
আজকে শুধু বলি বাবা— থেকো সারাক্ষণ, 
তুমি আছো বলেই আমার সুন্দর এই জীবন। 



জামাইষষ্ঠী

জামাইষষ্ঠী এল বলে সাজল শ্বশুরবাড়ি, 
শাশুড়িমা ভোর থেকেই রাঁধেন নানান তরকারি।
নতুন ধুতি পরে জামাই এলেন হেসে ধীরে,
উলুধ্বনি আর শঙ্খ বাজে আনন্দভরা নীড়ে।
দই-চিঁড়ে আর মিষ্টি দিয়ে হলো শুভ বরণ,
আশীর্বাদের স্নেহ ছোঁয়ায় ভরে উঠল জামাইয়ের মন।
লুচি, পোলাও, ইলিশ, চিংড়ি, সাজল ভোজের থালা,
শাশুড়িমা বলেন হেসে, “খাও গো জামাই, বাবা!”
জামাই বলে, “আর যে পারি না, ভরল আমার পেটটা”,
শাশুড়ি কয়, “‌ বছরে তো একদিনই জামাইষষ্ঠীটা!”
শ্বশুরমশাই মুচকি হেসে বাড়িয়ে দিলেন পান,
জামাইবাবুর মুখের কোণে ফুটল সুখের গান।
আদর-যত্ন, হাসি-ঠাট্টায় কেটে গেল বেলাটা,
মনে মনে ভাবেন জামাই—“বাহ্! কী সুখের দিনটা!”
জামাই তখন মুচকি হেসে বললেন মনে মনে—
“জামাইষষ্ঠী বছরে একদিন, বাকি দিন তো গৃহকোণে!”
জামাইষষ্ঠী তাই যে ভাই, বড়ই মধুর দিন,
একদিনের রাজা সেজে জামাই, খুশি থাকে এইদিন। 
আদর-যত্ন, মজা-ঠাট্টা, সব উৎসবই বারবার 
বছরের এই একটি দিনে জামাইষষ্ঠী কিন্তু একবার।


শুধু তুই

তুই ছিলি হৃদয় জুড়ে, হারিয়ে গেলি কালের স্রোতে,
তবু তোর স্মৃতিগুলো, জেগে থাকে নীরব রাতে।
ফুল ঝরেছে, রাত পেরিয়েছে, শুকিয়েছে নদীর জল,
তবু কেন তোরই স্মৃতিতে, ভিজে ওঠে আঁখির তল।
তুই নেই তবু সন্ধ্যাবেলা জানালাটা খোলা রাখি,
ফিরবি না জেনেও কেন, পথের পানে চেয়ে থাকি।
তুই নেই বলে সন্ধ্যাগুলো আজও বড়ো নিরাশা,
ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে থেকেও, খুঁজি তোরই ভালোবাসা।
সময় কত দূর গড়ালো, বদলে গেল চারিপাশ,
তবু কেন তোরই জন্য বুকে জমে দীর্ঘশ্বাস।
 কান্নারা সব থেমে যাবে, তবুও আমি তোকেই ছুঁই,
পাওয়া -না পাওয়ার এই গল্পে, থাকবি—শুধু তুই।

লড়াই

আমি নন্দিনীকে কোনোদিন দেখিনি। তার সঙ্গে আমার কোনো পরিচয়ও নেই। তবু মাঝে মাঝে মনে হয়, আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা হাজারো মুখের ভিড়ে নন্দিনীর মতো কারও না কারও সঙ্গে প্রতিদিন দেখা হয়েই যায়।

নন্দিনী এক নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়ে। গ্রামের বাইরে একটি স্টেশনের ধারে তার বাবার একটি ছোট্ট দোকান ছিল। দোকান বলতে খুব বেশি কিছু নয়। ট্রেন থামলে যাত্রীরা দু-এক কাপ চা খেতেন, কেউ বিস্কুট কিনতেন, কেউ আবার শুধু একটু গল্প করে চলে যেতেন। সেই সামান্য আয়ের ওপরই দাঁড়িয়ে ছিল একটি সংসার। হিসেব ছিল ছোট। কিন্তু স্বপ্ন? স্বপ্ন ছিল অনেক বড়।
নন্দিনী সদ্য উচ্চমাধ্যমিক পাস করেছে। ফলও বেশ ভালোই। তার ইচ্ছে ছিল ডাক্তার হবে। ছোটবেলা থেকেই অসুস্থ মানুষদের দেখলে তার মন কেমন করে উঠত। গ্রামের অনেক মানুষ অর্থের অভাবে কিংবা চিকিৎসকের অভাবে ঠিকমতো চিকিৎসা পেতেন না। কারও জ্বর সপ্তাহের পর সপ্তাহ চলত, কেউ আবার হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই হাল ছেড়ে দিতেন অর্থের অভাবে।

এসব দেখেই নন্দিনী ভাবত—
“একদিন আমি ডাক্তার হব। এমন একজন ডাক্তার, যার দরজা কারও জন্য বন্ধ থাকবে না।”

তার বাবা প্রায়ই বলতেন —
 “ নন্দিনী, আমি তোকে পড়াশোনা শেখাব। বড়ো ডাক্তার বানাব। তোকে মানুষের মতো মানুষ করব। তুই শুধু লড়াইটা চালিয়ে যা।”

আমি জানি না, একজন বাবার মুখে উচ্চারিত এই কথাগুলোর ওজন কতটা। তবে এটুকু জানি, নিম্নবিত্ত মানুষের স্বপ্নের ভেতর সবচেয়ে বেশি মিশে থাকে ত্যাগের গন্ধ। কিন্তু জীবন সবসময় মানুষের স্বপ্নের পাশে দাঁড়ায় না। সরকার থেকে ঘোষণা হল স্টেশন চত্বর নতুন করে সাজানো হবে। অবৈধ দখল সরাতে প্রশাসন অভিযান চালাবে। শহরকে আরও আধুনিক, আরও সুন্দর করে তোলার পরিকল্পনা হয়েছে। পরিকল্পনা সত্যিই বাস্তবায়িত হলো। বুলডোজার এল। মানচিত্র বদলাতে শুরু করল। কিন্তু মানচিত্র বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে কিছু মানুষের জীবনও বদলে গেল। যে দোকানগুলো বছরের পর বছর স্টেশনের ধারে দাঁড়িয়ে ছিল, সেগুলো একে একে ভেঙে ফেলা হলো। কারও ব্যবসা উঠে গেল, কারও রুজিরুটি হারিয়ে গেল। নন্দিনীর বাবার সেই ছোট্ট দোকানটাও রক্ষা পেল না। যে দোকানের কাঠের বেঞ্চে বসে কত মানুষ চা খেয়েছে, যে দোকানের আয় দিয়ে নন্দিনীর বই কেনা হয়েছে, যে দোকানের স্বপ্নে ভর করেই একটি পরিবার বেঁচে ছিল সেটা কয়েক মিনিটের মধ্যেই ধুলোয় মিশে গেল। সেদিন সন্ধ্যায় নন্দিনীর বাবা বাড়ি ফিরেছিলেন খালি হাতে। কোনো বাজারের থলে ছিল না।শুধু একরাশ নীরবতা ছিল। 

নন্দিনীর মা ধীরে জিজ্ঞেস করেছিলেন—
 “আজ কিছু আনোনি?”

তিনি উত্তর দেননি। কখনও কখনও মানুষের নীরবতাই সবচেয়ে বড় উত্তর হয়ে ওঠে। সেদিনই রাত্রে নন্দিনী বই খুলে বসেছিল ঠিকই। কিন্তু একটি লাইনও পড়তে পারেনি। চোখের সামনে শুধু ভেসে উঠছিল তার বাবার মুখ। 

কয়েকদিন পরে সে বাবাকে বলতে শুনল —
 “এবার হয়তো পড়াশোনাটা একটু থামাতে হবে... সংসারটা আগে সামলাতে হবে।”

‘একটু’। শব্দটা খুব ছোট্ট। কিন্তু নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনে এই ‘একটু’ শব্দটাই অনেক সময় আজীবনের দূরত্ব হয়ে দাঁড়ায়। আর সেই ‘একটু’ কখন যে কয়েক বছর হয়ে যায়, কেউ বুঝতেই পারে না।

 নন্দিনী কিছু বলেনি। শুধু জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দূরে ছুটে যাওয়া ট্রেনগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল। তারপর শুরু হলো অন্য লড়াই। ভোরবেলা কয়েকজন ছাত্রছাত্রীকে পড়ানো। দুপুরে লাইব্রেরিতে বসে নিজের পড়াশোনা। রাতে স্থানীয় ওষুধের দোকানে হিসেব লেখা। পুরোনো বই কিনে পড়া। ফ্রি অনলাইন ক্লাস দেখা। ফর্ম ফিল-আপের টাকা জোগাড় করতে নিজের কিছু প্রিয় বই পর্যন্ত বিক্রি করে দেওয়া। তার সংগ্রামের গল্পে কোনো নাটকীয়তা ছিল না। কেউ তাকে সাহায্যের জন্য হাত বাড়ায়নি। কেউ তাকে সংবাদপত্রের শিরোনামও বানায়নি। 
বরং অনেকেই বলেছিল— 
“এত কষ্ট করে লাভ কী?”, “বাস্তবটা মেনে নিতে শেখো।”, “ডাক্তারি সবার জন্য নয়।”

নন্দিনী এসব শুনে কোন উত্তর দেয় নি। কারণ সে বুঝে গিয়েছিল, দারিদ্র্য শুধু মানুষের পকেট খালি করে না; দারিদ্র্য প্রথমে মানুষের কল্পনাশক্তিকে হত্যা করে। যেদিন মানুষ স্বপ্ন দেখা বন্ধ করে দেয়, সেদিনই লড়াইটা থেমে যায়। 

নন্দিনী তার জীবনের প্রতিটি দিন, প্রতিটি কষ্ট, প্রতিটি না-পাওয়ার গল্প ডায়েরির পাতায় লিখে রাখত। সেদিনও লিখেছিল। তবে সেদিনের লেখায় ছিল প্রশ্ন, ক্ষোভ আর এক অদৃশ্য প্রতিবাদ। 

সে লিখেছিল—
“হ্যাঁ, রেলের জমি দখল করে দোকান বসানো আইনসঙ্গত নয়, আমি তা জানি। রাষ্ট্রের আইন আছে, নিয়ম আছে, উন্নয়নের পরিকল্পনাও আছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন যে মানুষটা বিশ বছর ধরে ওই দোকানের আয় দিয়ে সংসার চালিয়েছে, মেয়ের বই কিনেছে, করজোড়ে বেঁচে থাকার অধিকারটুকু চেয়েছে, তার জন্য কি কোনো পরিকল্পনা ছিল? বুলডোজার আসার আগে কি কেউ একবারও জিজ্ঞেস করেছিল— এরপর তুমি বাঁচবে কীভাবে? উন্নয়ন যদি মানুষের জীবনকে আরও সুন্দর করার নাম হয়, তাহলে কিছু মানুষের পেটের ভাত কেড়ে নিয়ে সেই উন্নয়নের উৎসব কাদের জন্য? আমার বাবার দোকানটা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। হয়তো আইনের চোখে সেটাই ঠিক। কিন্তু আইন কি কখনও সেই চোখের জল দেখে, যা দোকানের ভাঙা টিনের নিচে চাপা পড়ে যায়? রাষ্ট্রের কাছে আমার কোনো অভিযোগ নেই। শুধু একটা প্রশ্ন আছে—মানচিত্র বদলানোর সময় কি মানুষের জীবনটাকেও একটু দেখে নেওয়া যেত না?”

তারপর কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে নন্দিনী ডায়েরির শেষ পাতায় লিখেছিল—
“আমার বাবার দোকান সরকার ভেঙে দিয়েছে। কিন্তু আমার ভেতরের দোকানটা এখনও খোলা আছে। সেখানে স্বপ্ন বিক্রি হয় না, সেখানে স্বপ্ন জমা রাখা হয়। আর যতদিন সেই দোকান খোলা থাকবে, ততদিন কোনো বুলডোজার আমার ভবিষ্যৎ ভাঙতে পারবে না।”

তারপর?
তারপর কী হয়েছিল, আমি জানি না। নন্দিনী ডাক্তার হয়েছিল কি না, সেটাও আমার জানা নেই। হয়তো হয়েছে। হয়তোবা হয়নি। কিন্তু সত্যি বলতে কী, এই গল্পের শেষটা আমি ইচ্ছে করেই করিনি। গল্পের শেষটা আমার কাছে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণও নয়। কারণ এই গল্প সাফল্যের গল্প নয়। এই গল্প সেইসব মানুষের গল্প, যারা বারবার পড়ে গিয়েও উঠে দাঁড়াতে জানে। এই গল্প সেইসব বাবার গল্প, যারা নিজের ক্ষুধা লুকিয়ে সন্তানের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখে। এই গল্প সেইসব ছেলে-মেয়ের গল্প, যারা দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করেও নিজের স্বপ্নের কাছে আত্মসমর্পণ করে না। আজও হয়তো কোথাও কোনো নন্দিনী পড়ছে। কোনো লাইব্রেরির কোণে। কোনো টিউশনি শেষ করে। কোনো অন্ধকার ঘরে কেরোসিনের আলোয়।

আর আমি বিশ্বাস করি, এই পৃথিবীতে শেষ পর্যন্ত তাদের জন্যই একটু জায়গা হয়ে ওঠে, যারা হার মানতে শেখেনি। কারণ কিছু মানুষের জীবন জয় দিয়ে লেখা হয় না। লেখা হয় লড়াই দিয়ে। আর সেই লড়াইই একদিন ইতিহাস হয়ে যায়।

অন্নহারা


রেলের জমি রেলেরই হোক— ন্যায়ের এ উচ্চারণ,

তবু কেন পথে বসে কাঁদে অসহায় জনগণ?

স্টেশনের ওই কোলাহলে, ধোঁয়া-মাখা ভোরে,

কত মানুষের দিন গড়াত ক্ষুদ্র দোকান ঘিরে।

চায়ের কাপে, মুড়ির ঠোঙায়, সংসারেরই গান,

সন্ধ্যাবেলায় ফিরত ঘরে একমুঠো সম্মান।

আজকে সেখানে ধুলোর নাচন, ইটের স্তূপের সারি,

ভাঙা টিনের ফাঁক দিয়ে চায় বিষণ্ন চোখ দু'খানি।

আইন তারই কর্তব্যপথে অটল অবিচল,

কিন্তু ক্ষুধার আর্তনাদও কি মিথ্যে কোলাহল?

রাষ্ট্র যদি হয় বিধির রক্ষক, জনতারও ত্রাতা,

শুধু উচ্ছেদ নয়, তার আগে চাই মানবতার কথা।

শৃঙ্খলা ফিরুক, শান্তি আসুক, থাকুক বিধির মান,

তবু যেন না পথে নামে অসহায় পরিবারখান।

ধুলো-ওড়া সেই বিকেলবেলা প্রশ্ন রেখে যায়,

উন্নয়নের রথের চাকার নিচে কারা হারিয়ে যায়?

মানুষ যেন মানুষের পাশে দাঁড়ায় সবসময়,

ন্যায়ের সাথে মানবতারও হোক সমান জয়।

মোহভঙ্গ

সক্কাল বেলা উঠছি আমি, হাতে মোবাইলখান,
বউটা আইসা কইল তখন, কখন করবা স্নান?
কইলাম আমি, একটু থামো, দেখি খবরখান,
বউটা কইল, খবর পরে, আগে সাইরো স্নান!
চা বানাইয়া সামনে রাখে, ভইরা দিল কাপ,
ফোনের মাঝে ডুইবা থাকি, নাইকো কোনো চাপ।
দুপুর বেলা ভাত বাড়িয়া ডাকল বারংবার,
স্ক্রিনের পানে চাইয়া আছি, নাইকো হুঁশ আর।
দুপুর গইয়া বিকেল আইল, গেল কত বেলা,
মোবাইল লইয়া ডুইবা আছি, এই কি জীবনের খেলা?
রাইত হইলে বালিশ পাশে মোবাইলেরই ঠাঁই,
বউটা কইল, এই ঘরেতে আমার দরকার নাই?
রাগে কইলাম, ফোনটা কিন্তু বড়ই আপনজন,
বউটা কইল, তাইলে তারেই দিও মনের সিংহাসন!
হঠাৎ একদিন সেই ফোনটা হইল যে বেকার,
চার্জ দিলাম, চাপ দিলাম—চালু হইল না আর।
মুচকি হাইসা বউটা কইল, কই তোমার সেই প্রাণ?
মাথা নিচু কইরা কইলাম, তুমিই তো আমার জান।
এখন আমি ফোন ধরি, আর ধরি বউয়ের হাত,
শান্তিতে যায় সংসারখানা, সুখে কাটে দিন-রাত।

প্রাপ্তি

♥️প্রাপ্তির খাতায় জমে থাকা কিছু মুহূর্ত  ♥️



তাৎক্ষণিক বক্তৃতা, তৃতীয়, পুরন্দরপুর উচ্চ বিদ্যালয়, দাতা— শোভা মন্ডল, তাপাইপুর, বীরভূম (২০১৯)

বলরাম মন্ডল এবং হরনাথ মন্ডল স্মৃতি পুরস্কার, পুরন্দরপুর উচ্চ বিদ্যালয়, পুরন্দরপুর, বীরভূম (২০২২)

District winner, Speak for India, world Largest Debate contest, organised by Federal Bank, The Telegraph & Anandabazar Patrika (2024)

★ “Professor Sunil Kumar Nandi Memorial Award”, Best student in Education and Culture in English department, Suri Vidyasagar College, Birbhum (2024)

★ “Swachhata hi Seva” competition, organised by Regional office, Burdwan, Essay writing competition, Representing The University of Burdwan, secured 3rd position (2024)

xtrone'24, Inter College and Inter school fest, organised by St. Xavier's College, Burdwan, secured second position, X-conclave Debate (2024)

★  “উত্তম কুমার স্মৃতি কাপ সম্মান”, প্রদানকারী সংস্থা –পশ্চিমবঙ্গ সংস্কৃতি পরিষদ, কলকাতা (২০২৫)

“বড়দিদি সম্মান”, প্রদানকারী সংস্থা –স্বজন, হাওড়া, বাগনান (২০২৫)

“এপিজে আব্দুল কালাম স্মৃতি কাপ সম্মান”, প্রদানকারী সংস্থা -পশ্চিমবঙ্গ সাহিত্য মঞ্চ, কোলকাতা (২০২৫)

“ইউথ আইকন অ্যাওয়ার্ড”, প্রদানকারী সংস্থা- ইন্টারন্যাশনাল নিউস্টার, এগরা (২০২৫)

1st Runner Up, 7th Kolkata International Micro Film Festival, Cine writing competition, organised by Onu Chobi welfare Association (2026)

“স্বামী বিবেকানন্দ স্মৃতি সম্মান", প্রদানকারী সংস্থা- বাংলা লেখক চক্র, কোলকাতা (২০২৬)

“মানবিক কবি সম্মান”, প্রদানকারী সংস্থা–পশ্চিমবঙ্গ সাহিত্য মঞ্চ, কোলকাতা (২০২৬)

কার দিকে ঝুঁকবে মানুষের আস্থা

রাজনীতির থালায় যুবসমাজের অন্নপ্রাশন

দিগন্ত


কবিতা ক্লাব ফেসবুক পেজে প্রকাশিত 
দিগন্ত 👈 ক্লিক করুন 

কাঁঠাল কবি

রাত তখন প্রায় বারোটা ছুঁইছুঁই।
গ্রামের উপর নেমে এসেছে এক অদ্ভুত নীরবতা। দূরে বাঁশঝাড়ের ফাঁক দিয়ে হাওয়া বইছে “সসসস…” শব্দ তুলে। কোথাও এক-আধটা কুকুর অলস ভঙ্গিতে ডেকে উঠছে, আর পুকুরপাড়ে ব্যাঙেরা যেন গম্ভীর সভা বসিয়েছে।

ঠিক সেই সময় জমিদারবাড়ির পেছন দিক থেকে ভেসে এলো এক বিকট শব্দ—
“ঢপাস!”

শব্দটা এমন, যেন আকাশ থেকে কেউ একটা হাতি ছুড়ে ফেলেছে। চৌকিদার নিতাই তখন উঠোনের কোণে বসে আধঘুমে বিড়ি ধরিয়েছিল। শব্দ শুনে সে এমন লাফ দিল যে নিজের লুঙ্গিতেই প্রায় পা জড়িয়ে যাচ্ছিল।
— “ওরে বাবা! এ তো নিশ্চিত চোরের শব্দ!”

লাঠি হাতে ছুটতে ছুটতে সে চেঁচিয়ে উঠল—
 “ওরে কে কোথায় আছিস! জমিদারবাড়িতে ডাকাত পড়েছে রে!”

মুহূর্তের মধ্যে গোটা গ্রাম জেগে উঠল। কারও হাতে লণ্ঠন, কারও হাতে বাঁশ, কেউ আবার তাড়াহুড়োয় বউয়ের ঝাঁটা নিয়েই বেরিয়ে এসেছে। এক বুড়ো তো উত্তেজনায় নিজের হাঁটার লাঠির বদলে শাবল নিয়ে এসেছে।

সবাই গিয়ে দেখে কাঁঠালগাছের নিচে এক লোক চিৎপটাং হয়ে পড়ে আছে। মাথা থেকে পা পর্যন্ত কাঁঠালের আঠা, চুলে শুকনো পাতা, আর মুখে এমন কষ্টের ছাপ যেন তাকে একসাথে অঙ্ক, সংস্কৃত আর শ্বশুরবাড়ির প্রশ্নের উত্তর দিতে বলা হয়েছে।

নিতাই লাঠি ঠুকঠুক করে বলল—
 “ব্যাটা! কে তুই?”

লোকটা ধীরে ধীরে উঠে বসল। তারপর বুক ফুলিয়ে এমন গলায় বলল, যেন কলকাতার সাহিত্য সভায় এসেছে—
 “আমি… চোর নই। আমি কবি।”

এক মুহূর্ত নিস্তব্ধতা। তারপর ভিড়ের পেছন থেকে হারাধন বলে উঠল—
 “তা হলে নিশ্চয়ই কাঁঠালগুলো ছন্দ মিলিয়ে পাড়ছিল!”



চারদিকে হাসির রোল পড়ে গেল। জমিদারমশাই ততক্ষণে এসে গম্ভীর মুখে চেয়ারে বসেছেন। তাঁর বিশাল গোঁফ দেখে গ্রামের ছেলেপুলেরা পর্যন্ত ভয় পায়। তিনি চোখ কুঁচকে বললেন—
 “তা কবিমশাই, মাঝরাতে গাছে উঠে কাব্যচর্চা করছিলে নাকি?”

লোকটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল—
 “আজ পূর্ণিমা… বাতাসে পাকা কাঁঠালের গন্ধ… চারদিকে নিস্তব্ধতা… এমন রাতে মানুষের হৃদয়ে কবিতা জেগে ওঠে জমিদারমশাই।”

নিতাই বলল—
 “তা কবিতা জাগলে গাছে উঠতে হয়?”

লোকটা চোখ বন্ধ করে উত্তর দিল—
 “উচ্চতায় না উঠলে উচ্চ ভাব আসে না।”

এক বুড়ো সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল—
“বাপরে! এ তো দেখি বিএ পাশ চোর!”

আবার হাসির দমক উঠল। জমিদার এবার একটু রেগে বললেন—
 “তা হলে পড়ে গেলি কেন?”

লোকটা বুক টিপে গম্ভীর গলায় বলল—
 “কবিতা আর বাস্তবতার ভারসাম্য রাখতে পারিনি…”

এই কথা শুনে পাশের গরু পর্যন্ত “হাম্বা” করে উঠল।
মনে হলো সেও হাসি চেপে রাখতে পারছে না।
ঠিক তখন জমিদারের ছোট ছেলে দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল—
 “বাবা! বাবা! ওর পকেটে তিনটে কাঁঠালের কোয়া পেয়েছি!”

সবাই “ওওও!” করে উঠল।
জমিদার গম্ভীর হয়ে বললেন—
 “এবার বল! ওগুলো কেন?”

লোকটা শান্ত গলায় বলল—
“প্রমাণ।”

“কিসের প্রমাণ?”

“কাঁঠালটি সত্যিই পেকেছিল।”

নিতাই এত জোরে হেসে উঠল যে হাতে থাকা লাঠিটা মাটিতে ঠুকে নিজেই ভেঙে ফেলল। এরই মাঝে গ্রামের মাতব্বর গদাধর বললেন—
 “আমার মনে হয় এ লোককে থানায় না পাঠিয়ে যাত্রাদলে পাঠানো উচিত।”

পাশ থেকে কেউ বলল—
 “না না, যাত্রাদল কেন? এ তো ভোটে দাঁড়ালেই জিতবে!”

একজন আবার বলল—
“চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে যে এত সুন্দর ভাষণ দিতে পারে, সে বড় নেতা হবেই!”

এবার জমিদারবাবু একটু মজা পেতে শুরু করেছেন। তিনি হেসে বললেন—
 “আচ্ছা, শেষবার জিজ্ঞেস করছি… গাছে উঠলি কীভাবে?”

লোকটা গর্বিত মুখে বলল—
 “সাহস দিয়ে।”

— “আর নামলি?”

লোকটা আকাশের দিকে তাকাল। তারপর অত্যন্ত বিষণ্ন গলায় বলল—
 “মাধ্যাকর্ষণ শক্তি দিয়ে…”

এই কথা শুনে পুরো উঠোন ফেটে পড়ল হাসিতে।
কেউ হাঁটু চাপড়াচ্ছে, কেউ মাটিতে বসে গড়াগড়ি খাচ্ছে।
এক বুড়ি তো হাসতে হাসতে বলেই ফেলল—
 “হায় গো! এমন চোর যদি রোজ আসে, তা হলে বিনা টিকিটে নাটক দেখা যাবে!”

ঠিক তখন পাশের বাড়ির গণেশ হঠাৎ বলে উঠল—
 “এক মিনিট! এ লোকটাকে আমি চিনি!”

সবাই চুপ।

 “গত মাসে আমাদের আমগাছ থেকেও আম পাড়তে গিয়ে ধরা পড়েছিল। তখন নিজেকে বলেছিল ‘ফলতত্ত্ব গবেষক’!”


লোকটা একটু লজ্জা পেয়ে বলল—
 “গবেষণার কাজ করতেই হয়…”

জমিদার এবার হেসে কুটোপাটি। তিনি বললেন—
“আচ্ছা কবিমশাই, একটা কবিতা শুনিয়ে যান দেখি।”

লোকটা গলা খাঁকারি দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে আবৃত্তি শুরু করল—
 “কাঁঠালের ডাকে এলাম রাতে, জেগে ছিল চন্দ্র,
কবিতা খুঁজতে গাছে উঠি, ভুলে ভালো-মন্দ।
ডাল ভেঙে যে পড়লাম শেষে, সবার চোখের সামনে—
চোর নই গো, কাব্যই আমাকে ডুবিয়েছে বদনামে!”



শেষে জমিদার হেসে বললেন—
“যাও, আজ তোমাকে ছেড়ে দিলাম। তবে আবার যদি কবিতা লিখতে ইচ্ছে করে, কাগজে লিখবে… গাছে উঠে নয়!”

লোকটা হাত জোড় করে বলল—
 “কবির প্রতিজ্ঞা রইল।”

নিতাই পাশে দাঁড়িয়ে বিড়ি বার করতে করতে বলল—
“হুঁ… পরেরবার নিশ্চয়ই লিচুকবি হয়ে আসবে!”

সেই রাতের পর থেকে লোকটার আসল নাম কেউ আর মনে রাখেনি। গ্রামের ছোট থেকে বড় সবাই তাকে এক নামেই ডাকত—

সংগ্ৰাম

যাদের ঘামে জ্বলে ওঠে, আলোকিত এই পথ,
তাদের চোখে জমে থাকে, বঞ্চনারই রথ।
কারখানার লৌহ দ্বারে, কঠোর শাসন বাজে,
ন্যায্য কথা উচ্চারিলে ,ভয়ই সামনে সাজে।
যন্ত্রযুগের এই সময়ে, মানুষ যেন ক্ষীণ,
লাভের কাছে প্রতিদিনই, হারায় শ্রমের ঋণ।
কোথাও আবার দুর্ঘটনায়, ঝরে তাজা প্রাণ,
সংবাদ হয়ে মিলিয়ে যায়, কত অজানা নাম।
তবু তারা থামে না কভু, থামে না কর্মগান,
তাদের ঘামেই বেঁচে থাকে, সভ্যতার সম্মান।
ধনীর ঘরে আলো জ্বলে, শ্রমিকেরই শ্বাসে,
শ্রমিক তবু অন্ধকারে, আজও বাঁচে দীর্ঘ হতাশে।
শ্রমের ঘামে লেখা হোক, মানবতার জয়,
শ্রমিকেরই হাসির ভেতর, ভবিষ্যতের পরিচয়।
মে দিবসের এই প্রহরে, উঠুক সবার বাণী,
শ্রমিকেরই সম্মানেতে জাগুক, মানব-জয়ধ্বনি।

DEBRAJ SAHA TITLE SONG


A special song has been dedicated to Debraj Saha on the occasion of his 24th birth anniversary by MusicFul Hub.
The entire video and voice featured in this project have been created using Artificial Intelligence (AI) technology, blending creativity with modern innovation to present a unique musical tribute.


Lyrics :- Debjyoti 
Music Arrangement :- Akash 
Music Arrangements :- MUSICFUL HUB 
Voice :- AI 
Video Edit :- Itz Subha 
Thumbnail :- Subha 

────────────────────

© Copyright & Credits

This video, music composition, voice generation, and visual presentation are the intellectual property of MusicFul Hub.
All AI-generated audio, visuals, and creative elements are used for artistic and celebratory purposes only.

Unauthorized reproduction, redistribution, or commercial use of this content without prior permission from the creator is strictly prohibited.

All rights reserved © MusicFul Hub & Debraj Saha



 #debrajsaha #Amader_Debraj_Saha #WriterDebrajSaha #Debraj_Saha #DebrajSahaTitleSong #titlesong #bengali #Debraj #WriterDebraj #Debrajsahawriter #holy #holi #trending #bengali #ai #musicful #aisongs

রাত্রি ৩:১৫ : বসুভবনের অভিশাপ

 

রাত ৩টা ১৫। সমস্ত পৃথিবী ঘুমিয়ে থাকলেও কিছু ঘর জেগে থাকে।
বসুভবন ছিল ঠিক তেমন এক ঘর। বীরভূমের প্রত্যন্ত এক গ্ৰামের কাছে গভীর সবুজে ঢাকা, ঝোপজঙ্গলে ঘেরা এক ভূতুড়ে প্রাসাদ— বসুভবন। বছর ষাটেক আগেও লোকের আনাগোনা ছিল এখানে। জমিদার সূর্যকান্ত বসু ছিলেন তুখোড় শিকারি, সাহিত্যের ভক্ত, কিন্তু মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন। লোকমুখে শোনা যেত সূর্যকান্ত বসু অন্ধ ছিলেন। তবে তিনি সবসময় তাঁর হাতের কাছে একটি ছুড়ি এবং একটি ওয়াকিং স্টিক রাখতেন।

তার স্ত্রী মীনাক্ষী ছিলেন সুরের দেবী। কলকাতার নাট্যমঞ্চ থেকে সরাসরি এই গহীন গৃহে বন্দী হয়েছিলেন। কারণ একটাই—বিবাহ। আর তারপর যা ঘটেছিল, তা কারও জানা ছিল না পুরোপুরি, শুধু শোনা যেত এক নারীর গলা ফাটানো আর্তনাদ, এক শিশুর কান্না, আর ঘড়ির কাঁটা থেমে যাওয়া, যার সময় - রাত্রি ৩টা ১৫
বসুভবন ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হয়। ঝোপে ঢেকে যায় জানালা, দরজা। কিন্তু সেই ঘড়ির আওয়াজ আজও ভেসে আসে—যেদিন কেউ আসে… আর ফিরে যায় না।

২০২৫ সাল। দম্পতি অরিত্র ও অঙ্কিতা, ফটোগ্রাফি ও হন্টেড লোকেশনের উপর ডকুমেন্টারি বানানোর প্ল্যান করছিল। ইন্টারনেটে ‘India’s Most Haunted Places’ বলে একটা তালিকায় তারা দেখে “BasuVaban, Birbhum ”। অরিত্র খুব যুক্তিবাদী, নাস্তিক স্বভাবের মানুষ। ভূত-প্রেত মানে না।তবে ফটোগ্ৰাফির প্রতি তার আলাদা এক নেশা আছে বটে। বিশেষ করে ভুতুড়ে জায়গায় যেতে এবং সেখানে গিয়ে ফটোশুট করতে সে চরম ভালবাসত। যেটা অঙ্কিতা একদমই পছন্দ করতো না। কিন্তু অঙ্কিতার অনুভূতি তীক্ষ্ণ, চুপচাপ, দৃষ্টিতে কিছু চাপা ভয় লুকিয়ে থাকে। অরিত্র জোর করে রাজি করায়‌ অঙ্কিতাকে "ভয়কে ক্যামেরাবন্দি করতে হবে। ভয় থেকে পালিয়ে নয়, তাকে শুট করতে হয়।"
তারা এসে ওঠে বসুভবনের মূল ভবনে। আশপাশ ফাঁকা, সঙ্গী শুধু পুরনো জীর্ণ গাছের হাওয়া ও সেই কাঁপা কাঁপা ঘড়ির শব্দ—টিক… টিক… টিক…

রাত ৩টা। অঙ্কিতা ঘুমাতে পারছে না। হঠাৎ কানে আসে দূর থেকে এক নারীকণ্ঠ— "আমার গলা ফিরিয়ে দাও… আমি কাউকে ছাড়ব না, কাউকে না"। এই বলে একটি জোরাল হাসি, যার আওয়াজ হয়তো এই বাড়ির বাইরে পর্যন্ত পৌছায় না। অঙ্কিতা হঠাৎ উঠে বসে, কিন্তু অরিত্র তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। অঙ্কিতা ঘড়ির দিকে তাকায়—৩:১৫। ঘড়ির কাঁটা এক মুহূর্তে থেমে যায়।
টিক… টিক……চুপ।
আর তারপর...
একটা ভয়ংকর ছুরির টানার আওয়াজ, যেন মনে হচ্ছে কাউকে কুপিয়ে খুন করা হচ্ছে। তার সঙ্গে সঙ্গে বাতাস হিম হয়ে আসে। অঙ্কিতা বুঝতে পারে, কেউ যেন ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে তাকে দেখতে পাচ্ছে… কোনো নারীর সাদা শাড়ি, রক্তমাখা মুখ… কিন্তু চেহারাটা যেন মানুষের নয়, চোয়াল খুলে হাঁ করে হাসছে।
সে চিৎকার করতে চায়, কিন্তু তার গলা শুকিয়ে যায়।

পরদিন স্থানীয় পুরোহিত সোহম ভট্টাচার্য্য সঙ্গে দেখা করে অরিত্র। তিনিই জানান এই বসুভবন বাড়ির আসল রহস্য-
“সূর্যকান্ত তাঁর স্ত্রীর গানে সন্দেহ করত। বিশ্বাস করত, গান গেয়ে সে অন্য পুরুষদের ডাকে। শেষে এক রাতে, পেন্ডুলামের ঘড়ি ঠিক রাত্রি ৩টা ১৫ তে সে তার স্ত্রীর গলা কাটে সেই কণ্ঠস্বর থামানোর জন্য। কিন্তু শেষ নিঃশ্বাসে মীনাক্ষী অভিশাপ দেয়—
‘যে এই ঘরে গলায় আওয়াজ তুলবে, তার কণ্ঠ আমায় ফিরিয়ে দিতে হবে।'
তখন থেকেই, প্রতি রাতে কেউ না কেউ সেই ঘর থেকে নিখোঁজ হয়।”

সেদিন রাত্রেই অরিত্র ঠিক করে আজ কিছুই ভয় পাবে না। সে ক্যামেরা বসিয়ে দেয় আয়নার মুখোমুখি। আর অঙ্কিতাকে দিয়ে রেকর্ডিং করায় -- গানের মাধ্যমে। এভাবে চলতে চলতে ঘড়ির কাঁটা প্রথমে পৌছায় ২:৫৭… ৩:০৩… এবং তারপরই ৩:১৫। ঘড়ি থেমে যায়। অঙ্কিতার গানও হঠাৎ থেমে যায়। তার চোখ ছানাবড়া, সে আয়নার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠে। আয়নার মধ্যে দেখা যায়—একটি গলা কাটা মহিলা, যার চোয়াল অস্বাভাবিকভাবে নিচে ঝুলে পড়েছে, চোখদুটো রক্তে ডোবা। সে অঙ্কিতার দিকে এগিয়ে আসে, আয়নার ভেতর থেকে বাইরে। ঘরজুড়ে বাতাসটা জমে বরফ হয়ে গেল যেন। ক্যামেরা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল। আর তারপর...?

বেশ কয়েক মাস পর একটি ফুটেজ ইউটিউবে আপলোড হয়, নাম: “REAL POSSESSION CAUGHT ON CAMERA AT BASUVABAN
ভিডিওটা এখনো কেউ হ্যাক করে ডিলিট করেনি। তবে ভিউজ যে খুব একটা বেশি তাও নয়। এমনকি ভিডিওটির কেমেন্ট বক্সও ফাঁকা।
ভিডিওর শেষ ফ্রেমে দেখা যায়—অরিত্র অচেতনভাবে পড়ে আছে ঘরের মেঝেতে, তার পেছনে দাঁড়িয়ে রয়েছে অঙ্কিতা। কিন্তু তার মুখ, তার চোখ… আর আগের মতো নেই।
ক্যামেরা বন্ধ হওয়ার আগের মুহূর্তে অঙ্কিতা ইংরেজিতে কিছু একটা যেন বলে। তবে স্পষ্টভাবে শুনলে বোঝা যাচ্ছে, সে বলেছে - 
"To be Continued..."

টিউশন মাস্টার


ছোট থেকেই সংসারের ভারটা কাঁধে তুলে নিয়েছে সে। বন্ধুরা যখন মাঠে দৌড়াত, মাঠে খেলাধুলা করতো, পাড়ার ঠেকে আড্ডা মারত, আর সে তখন ক্যালকুলেটর হাতে নিয়ে হিসেব করত যে মাসের শেষে কতগুলো টিউশন বাড়ি পেলে ভাত-ডালটা নিশ্চিন্তে জুটবে। দুপুরে ইউনিভার্সিটির ক্লাস শেষ করে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে ছুটে যায় একটার পর একটা বাড়িতে।

 কারও মা বলে, “ওর ইংরেজিটা একটু দুর্বল,” 
কেউ বলে, “অঙ্কটা ভালো করে দেখিয়ে দিও।”

তবু মাসের শেষে দৃশ্যটা একই।
 দরজার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁপা গলায় বলে—“এই মাসের টাকাটা যদি…” 
বাকিটা মুখে আনে না। গলায় আটকে যায় শব্দ। 
তারপর একরাশ হাসি দিয়ে বলে, “থাক, পরে দিলেও হবে।”

সে দেখে তাদের সামনের ঘরে টিভি চলছে, গন্ধ উঠছে সদ্য রান্না করা খাবারের, কিন্তু তার হাতে তখন কেবল একটি পেন, ব্যাগ আর ছেঁড়া একটা কাগজের খাতা। বাড়ি ফিরে আলো-আঁধারিতে খাতার পাতা খোলে সে। অঙ্কগুলো ঠিকঠাক মিলছে, কিন্তু জীবনের অঙ্কটা কিছুতেই মিলছে না। টেবিলের পাশে রাখা চায়ের কাপটা ঠান্ডা হয়ে যায়, তবুও সে খাতার দিকে তাকিয়ে বসে থাকে, আর মাথায় হাজার চিন্তা। 
সে মনে মনে ভাবে "কাল আবার যাব"। 
কারণ তার না গেলে যে সংসারটা থেমে যাবে। মা-বাবার ওষুধ, বোনের টিফিন, নিজের বই এসবই যে সেই টিউশন টাকাটার ওপরেই দাঁড়িয়ে আছে।

রাতে আলো নিভে গেলে একা বসে থাকে সে। ঘরের কোণে বাতাসও তখন ভারী হয়ে ওঠে। কখনও ভাবে, যাদের সে পড়ায়, তারা একদিন বড় হবে, সফল হবে, হয়তো বিদেশেও যাবে। তাদের সার্টিফিকেটে থাকবে স্বপ্নের সই, কিন্তু এই মানুষটার নামটা কোথাও থাকবে না। তবু পরদিন সকাল হলে সে আবার ব্যাগটা তুলে নেয়। 
হাসিমুখে বলে, “চল, আজ ইংরেজিতে Tense টা শেখাই।”

কারণ সে জানে পড়ানোই তার একমাত্র শান্তি, যেখানে যত দুঃখই থাক, বোর্ডে চক তুলে নিলেই সব দুঃখ-কষ্ট কোথায় যেন মিলিয়ে যায়।

হ্যাঁ, সেই টিউশন মাস্টার টা—
যার জীবন মানে পরের ভবিষ্যতের জন্য নিজের বর্তমানকে হারিয়ে ফেলা। তবু মুখে হাসি থাকে, চোখে থাকে নীরব জলের ঝিলিক। কারণ সে জানে এই হাসিটাই তাদের শেষ সম্বল। আর হয়তো সেই হাসিটাই একদিন হয়ে উঠবে তার সবচেয়ে বড় জয়।

SIR: নাগরিক যাচাই না কি রাজনৈতিক চাল!

বাংলা সহ দেশের বারোটি রাজ্যে শুরু হতে চলেছে SIR (Special Intensive Revision)। সাধারণভাবে এটি নির্বাচন কমিশনের একটি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। যেখানে ভোটার তালিকা, সংশোধন ও নতুন নাম সংযোজন করা হয়। কিন্তু এর গভীরে তাকালে বোঝা যায় এটি কেবল নামের তালিকা নয়, এটি আমাদের নাগরিক অস্তিত্বের একটি দলিল, আমাদের গণতন্ত্রে অংশগ্রহণের ন্যূনতম অধিকার। 
আজকের দিনে পরিচয়ের রাজনীতি যত জটিল হয়ে উঠেছে, ততই এই ধরনের প্রক্রিয়াগুলি এক গভীর সামাজিক তাৎপর্য বহন করে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছেন, সোমবার রাত ১২টা থেকে ভোটার তালিকা ‘ফ্রিজ’ করে দেওয়া হবে। অর্থাৎ এরপর থেকে পুরনো তথ্য বন্ধ হয়ে যাবে এবং নতুন করে যাচাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু হবে। BLO বা বুথ-লেভেল অফিসাররা মঙ্গলবার থেকেই মাঠে নামবেন। তাঁরা প্রতিটি পাড়ায়, প্রতিটি ঘরে গিয়ে যাচাই করবেন কারা ভোটার তালিকায় আছেন, কারা বাদ পড়েছেন, আর নতুনভাবে কাকে যুক্ত করা যায়। তিন দফায় ভেরিফিকেশন চলবে। যাতে কোনো যোগ্য নাগরিক বাদ না যান এবং কোনো ভুয়ো নাম যুক্ত না হয়। এছাড়াও প্রবীণ ও অক্ষম নাগরিকদের জন্য অনলাইন ফর্ম পূরণের সুবিধা রাখা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে প্রযুক্তির নাগরিকীকরণের এক ইতিবাচক দিক। কিন্তু এর সঙ্গে একটা বড় প্রশ্নও থেকে যায়, আমরা কি যথেষ্ট সচেতন?

প্রায়ই দেখা যায়, নাগরিকরা ভোটের ঠিক আগেই বুঝতে পারেন তাঁদের নাম তালিকায় নেই, বা ঠিকানায় ভুল হয়েছে। অথবা তথ্যগত ত্রুটি। অথচ সংশোধনের এই সময়টাতেই সেই ভুল শুধরে নেওয়ার সুযোগ থাকে। আমাদের অনেকের কাছে ভোট কেবল নির্বাচনের দিনে একদিনের ঘটনা, কিন্তু SIR-এর মতো প্রক্রিয়াই আসলে সেই প্রস্তুতির ভিত্তি তৈরি করে। এখানেই নাগরিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নটি এসে দাঁড়ায়। গণতন্ত্র কেবল শাসকের দায় নয়, একজন নাগরিকেরও প্রতিশ্রুতি। তালিকায় নিজের নাম নিশ্চিত করা, তথ্য যাচাই করা, প্রয়োজনে আপডেট করা, এগুলোই সেই প্রতিশ্রুতির সূক্ষ্ম প্রকাশ।অনেক সময় শহুরে উদাসীনতার আড়ালে আমরা ভুলে যাই যে এই ছোট ছোট কাজগুলোই রাষ্ট্রের বৃহৎ কাঠামোকে সচল রাখে। তবে এই প্রক্রিয়ায় কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। মাঠ পর্যায়ে BLO-দের কাজ নিঃসন্দেহে কঠিন। আর রাজনৈতিক চাপ, তথ্যভ্রান্তি ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা অনেক সময় স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তাই নির্বাচন কমিশনের উচিত পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও তদারকির মাধ্যমে এই ব্যবস্থাকে আরও নির্ভরযোগ্য করে তোলা। তেমনি নাগরিক সমাজ, স্থানীয় সংগঠন ও রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত মানুষকে সচেতন করা যাতে কেউ বাদ না পড়ে, কেউ বিভ্রান্ত না হয়। SIR এর এই প্রক্রিয়াকে অনেকেই নিছক সরকারি কাজ হিসেবে দেখছেন। কিন্তু আমার মতে, এটি আসলে গণতন্ত্রের আত্মপরীক্ষা। ভোটার তালিকা মানে কেবল নামের তালিকা নয়, এটি নাগরিক স্বীকৃতির এক নৈতিক প্রতিফলন। আমরা প্রায়ই দেখি, ভোটের সময় অভিযোগ ওঠে কেউ ভোট দিতে পারেননি, কারও নাম বাদ গেছে, আবার কোথাও মৃত বা অপ্রাসঙ্গিক নাম রয়ে গেছে তালিকায়। এই অভিযোগগুলোর মূল কারণ নাগরিক সচেতনতার অভাব এবং প্রশাসনিক অসতর্কতা, যা SIR-এর মতো প্রক্রিয়ার সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে রোধ করা সম্ভব। তবে শুধু প্রশাসন নয়, দায় আমাদেরও। গণতন্ত্রে নাগরিকের ভূমিকা কেবল ভোট দেওয়া নয়, ভোটের আগে নিজের অস্তিত্ব নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নিজের নাম তালিকায় আছে কি না, ঠিকানা সঠিক কি না, বা নতুন প্রজন্মের নাম যুক্ত হয়েছে কি না এই ছোটখাটো যাচাইয়ের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিপক্বতা। SIR আমাদের সেই প্রশ্নটাই মনে করিয়ে দেয় আমরা কতটা সচেতন নাগরিক। আমরা কি সত্যিই আমাদের অধিকারকে মূল্য দিই, নাকি প্রশাসনের ওপরই সব দায় চাপিয়ে নিশ্চিন্ত থাকি?

আমার বিশ্বাস, এই প্রক্রিয়া যত বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে, ততই আমাদের গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে। প্রত্যেক নাগরিকের নাম তালিকায় থাকা মানে একেকটি জীবন রাষ্ট্রের গণনায় ধরা পড়ছে যার কণ্ঠস্বর ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্র গঠন করবে। অন্যদিকে, যদি নাগরিক নিজে উদাসীন থাকে, তাহলে গণতন্ত্র ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। তাই SIR কেবল একটি নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব নয় এটি আমাদের নাগরিক চেতনার প্রতিফলন। কিন্তু বাস্তবে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। অনেক সময় BLO-দের সংখ্যা যথেষ্ট নয়, তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়। এবং সাধারণ মানুষের কাছে পরিষ্কার ধারণা পৌঁছায়।

বিশেষত গ্রামীণ এলাকায় অনেকে জানেনই না যে এখনই তালিকা সংশোধনের সময় চলছে। ফলে সচেতনতার অভাবে বহু যোগ্য ভোটার বাদ পড়ে যান। আরও একটি সমস্যা হল প্রযুক্তিগত ব্যবধান। অনলাইন ফর্মের সুযোগ থাকলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ এখনও ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় অভ্যস্ত নন। তাই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য বাস্তবে পুরোপুরি সফল হতে হলে সচেতনতা এবং সহায়তা দুই দিকেই জোর দিতে হবে। 
বাংলার প্রেক্ষাপটে, যেখানে রাজনৈতিক মেরুকরণ গভীর, সেখানে SIR-কে ঘিরে আশঙ্কা এবং প্রত্যাশা দুটোই রয়েছে। একদিকে শাসকদল বলছে, “সব নাগরিকের নাম যেন তালিকায় থাকে, সেটাই লক্ষ্য।” অন্যদিকে বিরোধীরা অভিযোগ তোলে—“বিভিন্ন এলাকায় ভুয়ো নাম রয়ে গেছে বা নতুন ভোটার যুক্ত হতে পারছেন না।” রাজ্যে বা কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দল প্রায়ই এই প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করে। কখনও নাম বাদ দেওয়া, কখনও নির্দিষ্ট এলাকা বিশেষে যোগ-বিয়োগের অভিযোগ ওঠে। তাই নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এখানে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

বাস্তবতা হচ্ছে রাজনৈতিক স্বার্থের টানাপোড়েনের মাঝেও যদি প্রশাসন নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে পারে, তাহলেই SIR সত্যিকারের অর্থে মানুষের প্রক্রিয়া হয়ে উঠবে, রাজনৈতিক তকমা ছাড়াই।‌ তবে গণতন্ত্রের সাফল্য কখনো সংখ্যার উপর নির্ভর করে না, এটি নির্ভর করে সেই সংখ্যাগুলোর স্বচ্ছতার উপর। SIR সেই স্বচ্ছতাকে প্রতিষ্ঠা করার লড়াই, যেখানে রাজনীতি ও প্রশাসনের সীমানা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে সাধারণ মানুষ তার নিজের পরিচয়ের স্বীকৃতির অপেক্ষায়। তবে এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে নাগরিক অংশগ্রহণের ওপর।


এসআইআর – ভোটার তালিকা সংশোধন, না কি ভোটার সংশোধন!


 ৪ নভেম্বর থেকে পশ্চিমবঙ্গে শুরু হয়েছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (Special Intensive Revision)বা সংক্ষেপে এসআইআর। প্রায় তেইশ বছর পর এই প্রক্রিয়া ফের শুরু হওয়ায় একদিকে প্রশাসনিক তৎপরতা বাড়লেও, অন্যদিকে সৃষ্টি হয়েছে বিভ্রান্তি, সংশয় এবং ভয়ের আবহ। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে এখন বুথ লেভেল অফিসাররা (BLO) ঘরে ঘরে গিয়ে ভোটারদের এনুমারেশন ফর্ম বিলি করছেন, তথ্য সংগ্রহ করছেন। গণতন্ত্রে ভোটার তালিকা শুদ্ধকরণ নিঃসন্দেহে জরুরি, কিন্তু প্রশ্ন উঠছে এই প্রস্তুতি কতটা পরিপক্ব, কতটা স্বচ্ছ, এবং কতটা মানবিক? 
কমিশন জানিয়েছে, এবার নাগরিকরা অনলাইনেও ফর্ম পূরণ করতে পারবেন। কিন্তু প্রথম দিন থেকেই সার্ভার বিপর্যয়, ওয়েবসাইট ডাউন থাকা, লগইন সংক্রান্ত সমস্যা দেখা দেয়। বহু মানুষ অভিযোগ জানিয়েছেন যে, পোর্টাল খোলা যাচ্ছিল না, অথবা তথ্য সেভ হচ্ছিল না। প্রযুক্তির যুগে এমন মৌলিক প্রশাসনিক ব্যর্থতা নিঃসন্দেহে প্রশাসনের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। আমার মতে গণতন্ত্রে তথ্যপ্রযুক্তি নাগরিকের বন্ধু হওয়ার কথা, কিন্তু আমাদের বাস্তবতায় সেটি প্রায়ই নাগরিকের প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। যাঁরা রাজ্যের বাইরে কর্মরত, বা যাঁরা প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ নন তাঁদের কাছে অনলাইন প্রক্রিয়াটি এক রীতিমতো পরীক্ষার মতো। বিশেষত বয়স্ক নাগরিকদের কাছে এটি প্রায় অতিক্রম্য বাধা। ফলে “ডিজিটাল বিভাজন”-এর বাস্তবতা আবারও সামনে এসেছে।

প্রশ্ন উঠছে, প্রযুক্তি কি সকলের জন্য সমানভাবে সহজলভ্য? ২০০২ সালের পর রাজ্যে প্রথমবার এই নিবিড় সংশোধন হচ্ছে। অর্থাৎ দুই দশকেরও বেশি পুরোনো ভোটার তালিকা এখন মিলিয়ে দেখা হচ্ছে বর্তমান তথ্যের সঙ্গে। কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৩২ শতাংশ ভোটারের তথ্য পুরোনো তালিকার সঙ্গে মিলেছে, বাকিদের যাচাই চলছে। এই বিশাল ব্যবধানই দেখাচ্ছে সময়ের সঙ্গে সমাজ, জনবিন্যাস ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা কতটা বদলে গেছে। গ্রাম শহরে পরিণত হয়েছে, পরিবার ছোট হয়েছে, অভিবাসন বেড়েছে। ফলে পুরোনো তথ্যের সঙ্গে নতুন তথ্যের তুলনা করতে গিয়ে তৈরি হচ্ছে ভুল, বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তা। দুই দশকের ব্যবধান মানে কেবল সময় নয়। এটি রাজনীতি, জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও নাগরিক চেতনার পরিবর্তনের প্রতিফলন। প্রশাসন যদি তা বুঝতে ব্যর্থ হয়, তবে এই প্রক্রিয়া গণতান্ত্রিক নয়, বরং যান্ত্রিক হয়ে দাঁড়াবে।
কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী, যাঁদের তথ্য পুরোনো তালিকার সঙ্গে মেলে না, তাঁদের নথি যাচাই করতে হবে। কিন্তু এখানেই নতুন বিপত্তি। গ্রামীণ ও আর্থিকভাবে দুর্বল মানুষের কাছে জন্মসনদ, ঠিকানার প্রমাণ বা আধার কার্ডের মতো নথি সবসময় থাকে না। অনেক সময় ঠিকানা বদল, বিবাহ বা কর্মসূত্রে স্থানান্তরিত হওয়া ইত্যাদি কারণে মানুষ নিজেই নিজের প্রমাণপত্র জোগাড় করতে হিমশিম খান। ফলে অনেকেই আশঙ্কা করছেন তাঁদের নাম বাদ পড়তে পারে ভোটার তালিকা থেকে। যেখানে রাষ্ট্র নাগরিকের পরিচয় নিশ্চিত করার কথা, সেখানে নাগরিককেই নিজের অস্তিত্ব প্রমাণে দৌড়ঝাঁপ করতে হচ্ছে।

বিভিন্ন জেলার খবরে লক্ষ করেছি, BLO বা স্থানীয় কর্মীদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। কোথাও ফর্ম বিলি না করে ফেলে রাখা হয়েছে, কোথাও আবার রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ উঠছে। বিরোধীরা দাবি করছে এসআইআর প্রক্রিয়া প্রশাসনের নয়, বরং রাজনৈতিক পক্ষপাতের শিকার হচ্ছে। তৃণমূল কংগ্রেস ইতিমধ্যেই অভিযোগ তুলেছে যে, এসআইআর-এর নামে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে।‌ রেড রোড থেকে জোড়াসাঁকো পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় নেতৃত্ব দিয়েছেন বিশাল মিছিলে। তাঁদের বক্তব্য, এই প্রক্রিয়া নিরপেক্ষ নয়; এর আড়ালে ভোটার তালিকা থেকে নির্দিষ্ট শ্রেণিকে বাদ দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে। অন্যদিকে, বিজেপির একাংশের দাবি, রাজ্য প্রশাসন নিজেই কমিশনের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। ফলে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের এক নতুন রাজনৈতিক টানাপোড়েনও স্পষ্ট হচ্ছে। প্রশাসনের লক্ষ্য অবশ্যই তালিকার শুদ্ধতা বৃদ্ধি করা। কিন্তু বাস্তবে যদি সেই শুদ্ধতার দোহাই দিয়ে মানুষ বাদ পড়ে, তাহলে এই প্রচেষ্টা গণতন্ত্রের পরিপন্থী হয়ে দাঁড়ায়। নাগরিক পরিচয় যে রাষ্ট্রের দান নয়, সেটি এই সময় বারবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া জরুরি। একজন নাগরিকের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া মানে তাঁর সামাজিক মর্যাদা ও আত্মসম্মানের ওপর আঘাত। এসআইআর প্রক্রিয়া নিছক ভোটার তালিকা সংশোধনের উদ্যোগ নয়; এটি রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও নাগরিক আস্থার এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাক্ষেত্র। রাজনীতির কোলাহলের বাইরে, এই প্রক্রিয়াটি নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস পুনর্গঠনের সুযোগ এনে দিতে পারত। যদি প্রশাসন সেটিকে সহানুভূতি ও স্বচ্ছতার সঙ্গে পরিচালনা করত। নির্বাচন কমিশন যেহেতু সাংবিধানিক সংস্থা, তাই তার নিরপেক্ষতা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠছে। বিরোধীরা অভিযোগ করছে কেন্দ্রের হস্তক্ষেপে রাজ্যের কমিশন অফিসারদের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে কমিশন বলছে, রাজ্যের রাজনৈতিক দলগুলিই মাঠ পর্যায়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। এই পারস্পরিক অভিযোগের মধ্যে আসল প্রশ্নটা হারিয়ে যাচ্ছে।


আজকের এসআইআর প্রক্রিয়া আমাদের চোখে এক আয়না যেখানে প্রশাসনিক জটিলতা, রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং নাগরিক অনিশ্চয়তা একসঙ্গে প্রতিফলিত হচ্ছে। ভোটার তালিকার শুদ্ধতা যেমন দরকার, তেমনি প্রয়োজন নাগরিকের সম্মান, আস্থা ও অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা। গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি তালিকার নিখুঁততায় নয়, বরং মানুষের আস্থায়। তবে সবশেষে একটিই প্রশ্ন থেকে যায় — মানুষ কি তাঁর ভোটাধিকার নিয়ে নিরাপদ বোধ করছেন?

এছাড়াও পড়ুন ফোকাস বেঙ্গলে 




বিশ্বকাপ জয়ের লেখা

অধিকার