Featured post

DEBRAJ SAHA TITLE SONG

A special song has been dedicated to Debraj Saha on the occasion of his 24th birth anniversary by MusicFul Hub. The entire vide...

DEBRAJ SAHA TITLE SONG


A special song has been dedicated to Debraj Saha on the occasion of his 24th birth anniversary by MusicFul Hub.
The entire video and voice featured in this project have been created using Artificial Intelligence (AI) technology, blending creativity with modern innovation to present a unique musical tribute.


Lyrics :- Debjyoti 
Music Arrangement :- Akash 
Music Arrangements :- MUSICFUL HUB 
Voice :- AI 
Video Edit :- Itz Subha 
Thumbnail :- Subha 

────────────────────

© Copyright & Credits

This video, music composition, voice generation, and visual presentation are the intellectual property of MusicFul Hub.
All AI-generated audio, visuals, and creative elements are used for artistic and celebratory purposes only.

Unauthorized reproduction, redistribution, or commercial use of this content without prior permission from the creator is strictly prohibited.

All rights reserved © MusicFul Hub & Debraj Saha



 #debrajsaha #Amader_Debraj_Saha #WriterDebrajSaha #Debraj_Saha #DebrajSahaTitleSong #titlesong #bengali #Debraj #WriterDebraj #Debrajsahawriter #holy #holi #trending #bengali #ai #musicful #aisongs

রাত্রি ৩:১৫ : বসুভবনের অভিশাপ

 

রাত ৩টা ১৫। সমস্ত পৃথিবী ঘুমিয়ে থাকলেও কিছু ঘর জেগে থাকে।
বসুভবন ছিল ঠিক তেমন এক ঘর। বীরভূমের প্রত্যন্ত এক গ্ৰামের কাছে গভীর সবুজে ঢাকা, ঝোপজঙ্গলে ঘেরা এক ভূতুড়ে প্রাসাদ— বসুভবন। বছর ষাটেক আগেও লোকের আনাগোনা ছিল এখানে। জমিদার সূর্যকান্ত বসু ছিলেন তুখোড় শিকারি, সাহিত্যের ভক্ত, কিন্তু মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন। লোকমুখে শোনা যেত সূর্যকান্ত বসু অন্ধ ছিলেন। তবে তিনি সবসময় তাঁর হাতের কাছে একটি ছুড়ি এবং একটি ওয়াকিং স্টিক রাখতেন।

তার স্ত্রী মীনাক্ষী ছিলেন সুরের দেবী। কলকাতার নাট্যমঞ্চ থেকে সরাসরি এই গহীন গৃহে বন্দী হয়েছিলেন। কারণ একটাই—বিবাহ। আর তারপর যা ঘটেছিল, তা কারও জানা ছিল না পুরোপুরি, শুধু শোনা যেত এক নারীর গলা ফাটানো আর্তনাদ, এক শিশুর কান্না, আর ঘড়ির কাঁটা থেমে যাওয়া, যার সময় - রাত্রি ৩টা ১৫
বসুভবন ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হয়। ঝোপে ঢেকে যায় জানালা, দরজা। কিন্তু সেই ঘড়ির আওয়াজ আজও ভেসে আসে—যেদিন কেউ আসে… আর ফিরে যায় না।

২০২৫ সাল। দম্পতি অরিত্র ও অঙ্কিতা, ফটোগ্রাফি ও হন্টেড লোকেশনের উপর ডকুমেন্টারি বানানোর প্ল্যান করছিল। ইন্টারনেটে ‘India’s Most Haunted Places’ বলে একটা তালিকায় তারা দেখে “BasuVaban, Birbhum ”। অরিত্র খুব যুক্তিবাদী, নাস্তিক স্বভাবের মানুষ। ভূত-প্রেত মানে না।তবে ফটোগ্ৰাফির প্রতি তার আলাদা এক নেশা আছে বটে। বিশেষ করে ভুতুড়ে জায়গায় যেতে এবং সেখানে গিয়ে ফটোশুট করতে সে চরম ভালবাসত। যেটা অঙ্কিতা একদমই পছন্দ করতো না। কিন্তু অঙ্কিতার অনুভূতি তীক্ষ্ণ, চুপচাপ, দৃষ্টিতে কিছু চাপা ভয় লুকিয়ে থাকে। অরিত্র জোর করে রাজি করায়‌ অঙ্কিতাকে "ভয়কে ক্যামেরাবন্দি করতে হবে। ভয় থেকে পালিয়ে নয়, তাকে শুট করতে হয়।"
তারা এসে ওঠে বসুভবনের মূল ভবনে। আশপাশ ফাঁকা, সঙ্গী শুধু পুরনো জীর্ণ গাছের হাওয়া ও সেই কাঁপা কাঁপা ঘড়ির শব্দ—টিক… টিক… টিক…

রাত ৩টা। অঙ্কিতা ঘুমাতে পারছে না। হঠাৎ কানে আসে দূর থেকে এক নারীকণ্ঠ— "আমার গলা ফিরিয়ে দাও… আমি কাউকে ছাড়ব না, কাউকে না"। এই বলে একটি জোরাল হাসি, যার আওয়াজ হয়তো এই বাড়ির বাইরে পর্যন্ত পৌছায় না। অঙ্কিতা হঠাৎ উঠে বসে, কিন্তু অরিত্র তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। অঙ্কিতা ঘড়ির দিকে তাকায়—৩:১৫। ঘড়ির কাঁটা এক মুহূর্তে থেমে যায়।
টিক… টিক……চুপ।
আর তারপর...
একটা ভয়ংকর ছুরির টানার আওয়াজ, যেন মনে হচ্ছে কাউকে কুপিয়ে খুন করা হচ্ছে। তার সঙ্গে সঙ্গে বাতাস হিম হয়ে আসে। অঙ্কিতা বুঝতে পারে, কেউ যেন ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে তাকে দেখতে পাচ্ছে… কোনো নারীর সাদা শাড়ি, রক্তমাখা মুখ… কিন্তু চেহারাটা যেন মানুষের নয়, চোয়াল খুলে হাঁ করে হাসছে।
সে চিৎকার করতে চায়, কিন্তু তার গলা শুকিয়ে যায়।

পরদিন স্থানীয় পুরোহিত সোহম ভট্টাচার্য্য সঙ্গে দেখা করে অরিত্র। তিনিই জানান এই বসুভবন বাড়ির আসল রহস্য-
“সূর্যকান্ত তাঁর স্ত্রীর গানে সন্দেহ করত। বিশ্বাস করত, গান গেয়ে সে অন্য পুরুষদের ডাকে। শেষে এক রাতে, পেন্ডুলামের ঘড়ি ঠিক রাত্রি ৩টা ১৫ তে সে তার স্ত্রীর গলা কাটে সেই কণ্ঠস্বর থামানোর জন্য। কিন্তু শেষ নিঃশ্বাসে মীনাক্ষী অভিশাপ দেয়—
‘যে এই ঘরে গলায় আওয়াজ তুলবে, তার কণ্ঠ আমায় ফিরিয়ে দিতে হবে।'
তখন থেকেই, প্রতি রাতে কেউ না কেউ সেই ঘর থেকে নিখোঁজ হয়।”

সেদিন রাত্রেই অরিত্র ঠিক করে আজ কিছুই ভয় পাবে না। সে ক্যামেরা বসিয়ে দেয় আয়নার মুখোমুখি। আর অঙ্কিতাকে দিয়ে রেকর্ডিং করায় -- গানের মাধ্যমে। এভাবে চলতে চলতে ঘড়ির কাঁটা প্রথমে পৌছায় ২:৫৭… ৩:০৩… এবং তারপরই ৩:১৫। ঘড়ি থেমে যায়। অঙ্কিতার গানও হঠাৎ থেমে যায়। তার চোখ ছানাবড়া, সে আয়নার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠে। আয়নার মধ্যে দেখা যায়—একটি গলা কাটা মহিলা, যার চোয়াল অস্বাভাবিকভাবে নিচে ঝুলে পড়েছে, চোখদুটো রক্তে ডোবা। সে অঙ্কিতার দিকে এগিয়ে আসে, আয়নার ভেতর থেকে বাইরে। ঘরজুড়ে বাতাসটা জমে বরফ হয়ে গেল যেন। ক্যামেরা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল। আর তারপর...?

বেশ কয়েক মাস পর একটি ফুটেজ ইউটিউবে আপলোড হয়, নাম: “REAL POSSESSION CAUGHT ON CAMERA AT BASUVABAN
ভিডিওটা এখনো কেউ হ্যাক করে ডিলিট করেনি। তবে ভিউজ যে খুব একটা বেশি তাও নয়। এমনকি ভিডিওটির কেমেন্ট বক্সও ফাঁকা।
ভিডিওর শেষ ফ্রেমে দেখা যায়—অরিত্র অচেতনভাবে পড়ে আছে ঘরের মেঝেতে, তার পেছনে দাঁড়িয়ে রয়েছে অঙ্কিতা। কিন্তু তার মুখ, তার চোখ… আর আগের মতো নেই।
ক্যামেরা বন্ধ হওয়ার আগের মুহূর্তে অঙ্কিতা ইংরেজিতে কিছু একটা যেন বলে। তবে স্পষ্টভাবে শুনলে বোঝা যাচ্ছে, সে বলেছে - 
"To be Continued..."

টিউশন মাস্টার


ছোট থেকেই সংসারের ভারটা কাঁধে তুলে নিয়েছে সে। বন্ধুরা যখন মাঠে দৌড়াত, মাঠে খেলাধুলা করতো, পাড়ার ঠেকে আড্ডা মারত, আর সে তখন ক্যালকুলেটর হাতে নিয়ে হিসেব করত যে মাসের শেষে কতগুলো টিউশন বাড়ি পেলে ভাত-ডালটা নিশ্চিন্তে জুটবে। দুপুরে ইউনিভার্সিটির ক্লাস শেষ করে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে ছুটে যায় একটার পর একটা বাড়িতে।

 কারও মা বলে, “ওর ইংরেজিটা একটু দুর্বল,” 
কেউ বলে, “অঙ্কটা ভালো করে দেখিয়ে দিও।”

তবু মাসের শেষে দৃশ্যটা একই।
 দরজার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁপা গলায় বলে—“এই মাসের টাকাটা যদি…” 
বাকিটা মুখে আনে না। গলায় আটকে যায় শব্দ। 
তারপর একরাশ হাসি দিয়ে বলে, “থাক, পরে দিলেও হবে।”

সে দেখে তাদের সামনের ঘরে টিভি চলছে, গন্ধ উঠছে সদ্য রান্না করা খাবারের, কিন্তু তার হাতে তখন কেবল একটি পেন, ব্যাগ আর ছেঁড়া একটা কাগজের খাতা। বাড়ি ফিরে আলো-আঁধারিতে খাতার পাতা খোলে সে। অঙ্কগুলো ঠিকঠাক মিলছে, কিন্তু জীবনের অঙ্কটা কিছুতেই মিলছে না। টেবিলের পাশে রাখা চায়ের কাপটা ঠান্ডা হয়ে যায়, তবুও সে খাতার দিকে তাকিয়ে বসে থাকে, আর মাথায় হাজার চিন্তা। 
সে মনে মনে ভাবে "কাল আবার যাব"। 
কারণ তার না গেলে যে সংসারটা থেমে যাবে। মা-বাবার ওষুধ, বোনের টিফিন, নিজের বই এসবই যে সেই টিউশন টাকাটার ওপরেই দাঁড়িয়ে আছে।

রাতে আলো নিভে গেলে একা বসে থাকে সে। ঘরের কোণে বাতাসও তখন ভারী হয়ে ওঠে। কখনও ভাবে, যাদের সে পড়ায়, তারা একদিন বড় হবে, সফল হবে, হয়তো বিদেশেও যাবে। তাদের সার্টিফিকেটে থাকবে স্বপ্নের সই, কিন্তু এই মানুষটার নামটা কোথাও থাকবে না। তবু পরদিন সকাল হলে সে আবার ব্যাগটা তুলে নেয়। 
হাসিমুখে বলে, “চল, আজ ইংরেজিতে Tense টা শেখাই।”

কারণ সে জানে পড়ানোই তার একমাত্র শান্তি, যেখানে যত দুঃখই থাক, বোর্ডে চক তুলে নিলেই সব দুঃখ-কষ্ট কোথায় যেন মিলিয়ে যায়।

হ্যাঁ, সেই টিউশন মাস্টার টা—
যার জীবন মানে পরের ভবিষ্যতের জন্য নিজের বর্তমানকে হারিয়ে ফেলা। তবু মুখে হাসি থাকে, চোখে থাকে নীরব জলের ঝিলিক। কারণ সে জানে এই হাসিটাই তাদের শেষ সম্বল। আর হয়তো সেই হাসিটাই একদিন হয়ে উঠবে তার সবচেয়ে বড় জয়।

SIR: নাগরিক যাচাই না কি রাজনৈতিক চাল!

বাংলা সহ দেশের বারোটি রাজ্যে শুরু হতে চলেছে SIR (Special Intensive Revision)। সাধারণভাবে এটি নির্বাচন কমিশনের একটি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। যেখানে ভোটার তালিকা, সংশোধন ও নতুন নাম সংযোজন করা হয়। কিন্তু এর গভীরে তাকালে বোঝা যায় এটি কেবল নামের তালিকা নয়, এটি আমাদের নাগরিক অস্তিত্বের একটি দলিল, আমাদের গণতন্ত্রে অংশগ্রহণের ন্যূনতম অধিকার। 
আজকের দিনে পরিচয়ের রাজনীতি যত জটিল হয়ে উঠেছে, ততই এই ধরনের প্রক্রিয়াগুলি এক গভীর সামাজিক তাৎপর্য বহন করে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছেন, সোমবার রাত ১২টা থেকে ভোটার তালিকা ‘ফ্রিজ’ করে দেওয়া হবে। অর্থাৎ এরপর থেকে পুরনো তথ্য বন্ধ হয়ে যাবে এবং নতুন করে যাচাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু হবে। BLO বা বুথ-লেভেল অফিসাররা মঙ্গলবার থেকেই মাঠে নামবেন। তাঁরা প্রতিটি পাড়ায়, প্রতিটি ঘরে গিয়ে যাচাই করবেন কারা ভোটার তালিকায় আছেন, কারা বাদ পড়েছেন, আর নতুনভাবে কাকে যুক্ত করা যায়। তিন দফায় ভেরিফিকেশন চলবে। যাতে কোনো যোগ্য নাগরিক বাদ না যান এবং কোনো ভুয়ো নাম যুক্ত না হয়। এছাড়াও প্রবীণ ও অক্ষম নাগরিকদের জন্য অনলাইন ফর্ম পূরণের সুবিধা রাখা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে প্রযুক্তির নাগরিকীকরণের এক ইতিবাচক দিক। কিন্তু এর সঙ্গে একটা বড় প্রশ্নও থেকে যায়, আমরা কি যথেষ্ট সচেতন?

প্রায়ই দেখা যায়, নাগরিকরা ভোটের ঠিক আগেই বুঝতে পারেন তাঁদের নাম তালিকায় নেই, বা ঠিকানায় ভুল হয়েছে। অথবা তথ্যগত ত্রুটি। অথচ সংশোধনের এই সময়টাতেই সেই ভুল শুধরে নেওয়ার সুযোগ থাকে। আমাদের অনেকের কাছে ভোট কেবল নির্বাচনের দিনে একদিনের ঘটনা, কিন্তু SIR-এর মতো প্রক্রিয়াই আসলে সেই প্রস্তুতির ভিত্তি তৈরি করে। এখানেই নাগরিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নটি এসে দাঁড়ায়। গণতন্ত্র কেবল শাসকের দায় নয়, একজন নাগরিকেরও প্রতিশ্রুতি। তালিকায় নিজের নাম নিশ্চিত করা, তথ্য যাচাই করা, প্রয়োজনে আপডেট করা, এগুলোই সেই প্রতিশ্রুতির সূক্ষ্ম প্রকাশ।অনেক সময় শহুরে উদাসীনতার আড়ালে আমরা ভুলে যাই যে এই ছোট ছোট কাজগুলোই রাষ্ট্রের বৃহৎ কাঠামোকে সচল রাখে। তবে এই প্রক্রিয়ায় কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। মাঠ পর্যায়ে BLO-দের কাজ নিঃসন্দেহে কঠিন। আর রাজনৈতিক চাপ, তথ্যভ্রান্তি ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা অনেক সময় স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তাই নির্বাচন কমিশনের উচিত পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও তদারকির মাধ্যমে এই ব্যবস্থাকে আরও নির্ভরযোগ্য করে তোলা। তেমনি নাগরিক সমাজ, স্থানীয় সংগঠন ও রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত মানুষকে সচেতন করা যাতে কেউ বাদ না পড়ে, কেউ বিভ্রান্ত না হয়। SIR এর এই প্রক্রিয়াকে অনেকেই নিছক সরকারি কাজ হিসেবে দেখছেন। কিন্তু আমার মতে, এটি আসলে গণতন্ত্রের আত্মপরীক্ষা। ভোটার তালিকা মানে কেবল নামের তালিকা নয়, এটি নাগরিক স্বীকৃতির এক নৈতিক প্রতিফলন। আমরা প্রায়ই দেখি, ভোটের সময় অভিযোগ ওঠে কেউ ভোট দিতে পারেননি, কারও নাম বাদ গেছে, আবার কোথাও মৃত বা অপ্রাসঙ্গিক নাম রয়ে গেছে তালিকায়। এই অভিযোগগুলোর মূল কারণ নাগরিক সচেতনতার অভাব এবং প্রশাসনিক অসতর্কতা, যা SIR-এর মতো প্রক্রিয়ার সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে রোধ করা সম্ভব। তবে শুধু প্রশাসন নয়, দায় আমাদেরও। গণতন্ত্রে নাগরিকের ভূমিকা কেবল ভোট দেওয়া নয়, ভোটের আগে নিজের অস্তিত্ব নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নিজের নাম তালিকায় আছে কি না, ঠিকানা সঠিক কি না, বা নতুন প্রজন্মের নাম যুক্ত হয়েছে কি না এই ছোটখাটো যাচাইয়ের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিপক্বতা। SIR আমাদের সেই প্রশ্নটাই মনে করিয়ে দেয় আমরা কতটা সচেতন নাগরিক। আমরা কি সত্যিই আমাদের অধিকারকে মূল্য দিই, নাকি প্রশাসনের ওপরই সব দায় চাপিয়ে নিশ্চিন্ত থাকি?

আমার বিশ্বাস, এই প্রক্রিয়া যত বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে, ততই আমাদের গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে। প্রত্যেক নাগরিকের নাম তালিকায় থাকা মানে একেকটি জীবন রাষ্ট্রের গণনায় ধরা পড়ছে যার কণ্ঠস্বর ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্র গঠন করবে। অন্যদিকে, যদি নাগরিক নিজে উদাসীন থাকে, তাহলে গণতন্ত্র ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। তাই SIR কেবল একটি নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব নয় এটি আমাদের নাগরিক চেতনার প্রতিফলন। কিন্তু বাস্তবে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। অনেক সময় BLO-দের সংখ্যা যথেষ্ট নয়, তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়। এবং সাধারণ মানুষের কাছে পরিষ্কার ধারণা পৌঁছায়।

বিশেষত গ্রামীণ এলাকায় অনেকে জানেনই না যে এখনই তালিকা সংশোধনের সময় চলছে। ফলে সচেতনতার অভাবে বহু যোগ্য ভোটার বাদ পড়ে যান। আরও একটি সমস্যা হল প্রযুক্তিগত ব্যবধান। অনলাইন ফর্মের সুযোগ থাকলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ এখনও ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় অভ্যস্ত নন। তাই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য বাস্তবে পুরোপুরি সফল হতে হলে সচেতনতা এবং সহায়তা দুই দিকেই জোর দিতে হবে। 
বাংলার প্রেক্ষাপটে, যেখানে রাজনৈতিক মেরুকরণ গভীর, সেখানে SIR-কে ঘিরে আশঙ্কা এবং প্রত্যাশা দুটোই রয়েছে। একদিকে শাসকদল বলছে, “সব নাগরিকের নাম যেন তালিকায় থাকে, সেটাই লক্ষ্য।” অন্যদিকে বিরোধীরা অভিযোগ তোলে—“বিভিন্ন এলাকায় ভুয়ো নাম রয়ে গেছে বা নতুন ভোটার যুক্ত হতে পারছেন না।” রাজ্যে বা কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দল প্রায়ই এই প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করে। কখনও নাম বাদ দেওয়া, কখনও নির্দিষ্ট এলাকা বিশেষে যোগ-বিয়োগের অভিযোগ ওঠে। তাই নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এখানে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

বাস্তবতা হচ্ছে রাজনৈতিক স্বার্থের টানাপোড়েনের মাঝেও যদি প্রশাসন নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে পারে, তাহলেই SIR সত্যিকারের অর্থে মানুষের প্রক্রিয়া হয়ে উঠবে, রাজনৈতিক তকমা ছাড়াই।‌ তবে গণতন্ত্রের সাফল্য কখনো সংখ্যার উপর নির্ভর করে না, এটি নির্ভর করে সেই সংখ্যাগুলোর স্বচ্ছতার উপর। SIR সেই স্বচ্ছতাকে প্রতিষ্ঠা করার লড়াই, যেখানে রাজনীতি ও প্রশাসনের সীমানা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে সাধারণ মানুষ তার নিজের পরিচয়ের স্বীকৃতির অপেক্ষায়। তবে এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে নাগরিক অংশগ্রহণের ওপর।


এসআইআর – ভোটার তালিকা সংশোধন, না কি ভোটার সংশোধন!


 ৪ নভেম্বর থেকে পশ্চিমবঙ্গে শুরু হয়েছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (Special Intensive Revision)বা সংক্ষেপে এসআইআর। প্রায় তেইশ বছর পর এই প্রক্রিয়া ফের শুরু হওয়ায় একদিকে প্রশাসনিক তৎপরতা বাড়লেও, অন্যদিকে সৃষ্টি হয়েছে বিভ্রান্তি, সংশয় এবং ভয়ের আবহ। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে এখন বুথ লেভেল অফিসাররা (BLO) ঘরে ঘরে গিয়ে ভোটারদের এনুমারেশন ফর্ম বিলি করছেন, তথ্য সংগ্রহ করছেন। গণতন্ত্রে ভোটার তালিকা শুদ্ধকরণ নিঃসন্দেহে জরুরি, কিন্তু প্রশ্ন উঠছে এই প্রস্তুতি কতটা পরিপক্ব, কতটা স্বচ্ছ, এবং কতটা মানবিক? 
কমিশন জানিয়েছে, এবার নাগরিকরা অনলাইনেও ফর্ম পূরণ করতে পারবেন। কিন্তু প্রথম দিন থেকেই সার্ভার বিপর্যয়, ওয়েবসাইট ডাউন থাকা, লগইন সংক্রান্ত সমস্যা দেখা দেয়। বহু মানুষ অভিযোগ জানিয়েছেন যে, পোর্টাল খোলা যাচ্ছিল না, অথবা তথ্য সেভ হচ্ছিল না। প্রযুক্তির যুগে এমন মৌলিক প্রশাসনিক ব্যর্থতা নিঃসন্দেহে প্রশাসনের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। আমার মতে গণতন্ত্রে তথ্যপ্রযুক্তি নাগরিকের বন্ধু হওয়ার কথা, কিন্তু আমাদের বাস্তবতায় সেটি প্রায়ই নাগরিকের প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। যাঁরা রাজ্যের বাইরে কর্মরত, বা যাঁরা প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ নন তাঁদের কাছে অনলাইন প্রক্রিয়াটি এক রীতিমতো পরীক্ষার মতো। বিশেষত বয়স্ক নাগরিকদের কাছে এটি প্রায় অতিক্রম্য বাধা। ফলে “ডিজিটাল বিভাজন”-এর বাস্তবতা আবারও সামনে এসেছে।

প্রশ্ন উঠছে, প্রযুক্তি কি সকলের জন্য সমানভাবে সহজলভ্য? ২০০২ সালের পর রাজ্যে প্রথমবার এই নিবিড় সংশোধন হচ্ছে। অর্থাৎ দুই দশকেরও বেশি পুরোনো ভোটার তালিকা এখন মিলিয়ে দেখা হচ্ছে বর্তমান তথ্যের সঙ্গে। কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৩২ শতাংশ ভোটারের তথ্য পুরোনো তালিকার সঙ্গে মিলেছে, বাকিদের যাচাই চলছে। এই বিশাল ব্যবধানই দেখাচ্ছে সময়ের সঙ্গে সমাজ, জনবিন্যাস ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা কতটা বদলে গেছে। গ্রাম শহরে পরিণত হয়েছে, পরিবার ছোট হয়েছে, অভিবাসন বেড়েছে। ফলে পুরোনো তথ্যের সঙ্গে নতুন তথ্যের তুলনা করতে গিয়ে তৈরি হচ্ছে ভুল, বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তা। দুই দশকের ব্যবধান মানে কেবল সময় নয়। এটি রাজনীতি, জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও নাগরিক চেতনার পরিবর্তনের প্রতিফলন। প্রশাসন যদি তা বুঝতে ব্যর্থ হয়, তবে এই প্রক্রিয়া গণতান্ত্রিক নয়, বরং যান্ত্রিক হয়ে দাঁড়াবে।
কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী, যাঁদের তথ্য পুরোনো তালিকার সঙ্গে মেলে না, তাঁদের নথি যাচাই করতে হবে। কিন্তু এখানেই নতুন বিপত্তি। গ্রামীণ ও আর্থিকভাবে দুর্বল মানুষের কাছে জন্মসনদ, ঠিকানার প্রমাণ বা আধার কার্ডের মতো নথি সবসময় থাকে না। অনেক সময় ঠিকানা বদল, বিবাহ বা কর্মসূত্রে স্থানান্তরিত হওয়া ইত্যাদি কারণে মানুষ নিজেই নিজের প্রমাণপত্র জোগাড় করতে হিমশিম খান। ফলে অনেকেই আশঙ্কা করছেন তাঁদের নাম বাদ পড়তে পারে ভোটার তালিকা থেকে। যেখানে রাষ্ট্র নাগরিকের পরিচয় নিশ্চিত করার কথা, সেখানে নাগরিককেই নিজের অস্তিত্ব প্রমাণে দৌড়ঝাঁপ করতে হচ্ছে।

বিভিন্ন জেলার খবরে লক্ষ করেছি, BLO বা স্থানীয় কর্মীদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। কোথাও ফর্ম বিলি না করে ফেলে রাখা হয়েছে, কোথাও আবার রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ উঠছে। বিরোধীরা দাবি করছে এসআইআর প্রক্রিয়া প্রশাসনের নয়, বরং রাজনৈতিক পক্ষপাতের শিকার হচ্ছে। তৃণমূল কংগ্রেস ইতিমধ্যেই অভিযোগ তুলেছে যে, এসআইআর-এর নামে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে।‌ রেড রোড থেকে জোড়াসাঁকো পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় নেতৃত্ব দিয়েছেন বিশাল মিছিলে। তাঁদের বক্তব্য, এই প্রক্রিয়া নিরপেক্ষ নয়; এর আড়ালে ভোটার তালিকা থেকে নির্দিষ্ট শ্রেণিকে বাদ দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে। অন্যদিকে, বিজেপির একাংশের দাবি, রাজ্য প্রশাসন নিজেই কমিশনের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। ফলে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের এক নতুন রাজনৈতিক টানাপোড়েনও স্পষ্ট হচ্ছে। প্রশাসনের লক্ষ্য অবশ্যই তালিকার শুদ্ধতা বৃদ্ধি করা। কিন্তু বাস্তবে যদি সেই শুদ্ধতার দোহাই দিয়ে মানুষ বাদ পড়ে, তাহলে এই প্রচেষ্টা গণতন্ত্রের পরিপন্থী হয়ে দাঁড়ায়। নাগরিক পরিচয় যে রাষ্ট্রের দান নয়, সেটি এই সময় বারবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া জরুরি। একজন নাগরিকের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া মানে তাঁর সামাজিক মর্যাদা ও আত্মসম্মানের ওপর আঘাত। এসআইআর প্রক্রিয়া নিছক ভোটার তালিকা সংশোধনের উদ্যোগ নয়; এটি রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও নাগরিক আস্থার এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাক্ষেত্র। রাজনীতির কোলাহলের বাইরে, এই প্রক্রিয়াটি নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস পুনর্গঠনের সুযোগ এনে দিতে পারত। যদি প্রশাসন সেটিকে সহানুভূতি ও স্বচ্ছতার সঙ্গে পরিচালনা করত। নির্বাচন কমিশন যেহেতু সাংবিধানিক সংস্থা, তাই তার নিরপেক্ষতা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠছে। বিরোধীরা অভিযোগ করছে কেন্দ্রের হস্তক্ষেপে রাজ্যের কমিশন অফিসারদের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে কমিশন বলছে, রাজ্যের রাজনৈতিক দলগুলিই মাঠ পর্যায়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। এই পারস্পরিক অভিযোগের মধ্যে আসল প্রশ্নটা হারিয়ে যাচ্ছে।


আজকের এসআইআর প্রক্রিয়া আমাদের চোখে এক আয়না যেখানে প্রশাসনিক জটিলতা, রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং নাগরিক অনিশ্চয়তা একসঙ্গে প্রতিফলিত হচ্ছে। ভোটার তালিকার শুদ্ধতা যেমন দরকার, তেমনি প্রয়োজন নাগরিকের সম্মান, আস্থা ও অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা। গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি তালিকার নিখুঁততায় নয়, বরং মানুষের আস্থায়। তবে সবশেষে একটিই প্রশ্ন থেকে যায় — মানুষ কি তাঁর ভোটাধিকার নিয়ে নিরাপদ বোধ করছেন?

এছাড়াও পড়ুন ফোকাস বেঙ্গলে 




বিশ্বকাপ জয়ের লেখা

অধিকার


পুজো আসছে

 
ভোরবেলা থেকেই বৃষ্টি পড়ছে ঝিরঝির করে। চারপাশে জমে উঠেছে ঠান্ডা, ভেজা একটা গন্ধ। পল্টুর মা তখন রান্নাঘরে কাঁচা লঙ্কা বাটা আর পেঁয়াজ কুচোতে ব্যস্ত। হঠাৎই বাইরে থেকে পল্টু চিৎকার করে উঠলো—

— “মাআআ! ও মাআআ!”

পল্টুর মা অবাক হয়ে মাথা বের করলেন দরজার ফাঁক দিয়ে।

— “কী রে! এত আনন্দের কী হল? লাফাচ্ছিস কেন?”

পল্টু বলল — “মা! কাগজে পুজোবার্ষিকীর বিজ্ঞাপন বেরিয়েছে... বুঝলে ? আসছে মা! সে আসছে! দুর্গা, কাশফুল, আর... আর আনন্দমেলা'র গোয়েন্দা কাহিনি!”

মা একটু হাসলেন, “তা এত আনন্দের কি আছে বাপু ? যেন কি না কি বেরিয়েছে!”

পল্টু— “মা! তুমি বুঝবে না। এই বিজ্ঞাপন মানেই যেন আকাশে ঢাকের শব্দ শোনা যাচ্ছে! এটা একরকম ইশারা—পুজো আসছে! এর চেয়ে বড় সুখ কিছু হয়?”

মা বললেন— “তা বলছিস তো বেশ, আগে স্কুলের হোমওয়ার্ক শেষ কর!”

পল্টু গম্ভীর মুখে বলল— “এই পুজোবার্ষিকীর কাগজটা তো পাঠ্যবইয়েরই একটা অংশ মা! সাহিত্য না পড়লে পরীক্ষা কেমন করে দেব?”

মা মুখে চাপা হাসি চাপতে না পেরে বললেন— “তা হলে সুনীল এর লেখা পড়েই তুই গণিতে ৮৮ পেলি বুঝি?”

পল্টু ঠোঁট কুঁচকে বলল— “সেইটা তো... অন্য বিষয়! ওসব মার্কসের জন্য, আর এটা মন খুশি করার জন্য। দুই আলাদা মা!”

পল্টুর মা  জবাব দিল— “তাই নাকি? ওই সুনীল তো গতবারেও ‘শেষ বেলায় রহস্য’ লেখার পর বলেছিলেন, আর লিখবেন না। এবার আবার এলেন? উনি তো দেখি পেন রেখে উঠে দাঁড়ালেও, আবার বসে পড়েন!”

পল্টু নাক সিঁটকে বলল— “বুদ্ধিহীন প্রজন্ম! পুজো মানেই গোয়েন্দা গল্প। আর সুনীল আবার কি কথা? এমন ভাব করছো যেন তোমার বন্ধু। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলো। আর তাঁর নতুন গল্প একবারই আসে বছরে! ওসব তুমি বুঝবে না।"

মা  বলল— “হা! হা! হা! , বেশ তুই সব বুঝিস। তা হলে আগে সাহিত্যের মতো মুখ গম্ভীর করে বই পড়, আর আমি লুচির বদলে তোর জন্য একটা সাহিত্যমূলক রুটি বানাচ্ছি। নাম হবে—‘আলুভাজা ইন দ্য রেইন’।”

পল্টু চিৎকার করে উঠল— “চুপ করো মা ! সাহিত্য নিয়ে কটাক্ষ করো না! এবার আর সহ্য করব না!”

ওদিকে জানলার বাইরে বৃষ্টি ঝরছে টুপটাপ... আর ঘরের ভিতরে একটুকরো শারদ হাওয়া নেমে এসেছে খবরের কাগজের পাতার ফাঁক দিয়ে।
পুজো মানেই শুধু ঠাকুর দেখা নয় —
পুজো মানে “আসছে পুজোবার্ষিকী”র সেই শিরোনামটা দেখা, পৃষ্ঠার গন্ধ শুঁকে প্রথম গল্পটা কোন লেখকের তা দেখে নেওয়া, আর মা-সন্তানের খুনসুটি, আর লুচির গন্ধে ঘেরা ভোরবেলা।
.
.
.
.
কী তাই তো...?

আমি বাংলা

আমি বাংলা,আমি ভাষা
আমি গর্ব, আত্মবিশ্বাস
রক্তে লেখা আমার পরিচয় 
আমি মাটির বিশুদ্ধ শ্বাস।

তোমরা  জানো কে  আমি ?
আমিই  জনগণমনের  সুর 
আমিই স্কুলের প্রথম পাঠ 
আমার অবস্থান হৃদয়পুর।

আমার ভাষায় গান বেজে যায় 
 আহা ! জাতীয় গর্ব মিলেমিশে
আমার নামেই বন্দনা ' মা '- কে 
সেই ভাষা জাগে পাখির শিসে...

বলো , আজও  কেনো  তবে 
বাংলা নামে যা-খুশি তা রটে
অতীত ইতিহাস অস্বীকৃত হলে
তাতে বাংলার অপমান ঘটে। 

বাংলা-বাঙালির অনাহুত আঘাত 
এ দেশ ও জাতির  বড় বিস্ময়
 কথায়-কথায় আক্রমণ হানা
বোঝা যায় ইঙ্গিত ভালো নয়।

আমি বাংলা মাথা উঁচু 
কেন?অপমান হবে জমা !
অনুতাপ বুঝে শুধরে যাও 
বিবেক ক'রে দেবে ক্ষমা। 

যদি যত্রতত্র এমনই আবারও 
হয়  মিথ্যা অভিযোগ জমা 
দয়াপরবশ ক্ষমা করে বাঙালি
বিশ্ব স্বীকৃত বাঙালির দয়া-ক্ষমা।

চন্দ্ররূপে ঈশ্বর

 
যখন আকাশে আলোর অভাব হয়, মানুষ চেয়ে থাকে একটি প্রদীপের দিকে। আপনি ছিলেন সেই প্রদীপ যার শিখা নিভে যায়নি শতাব্দীর ঝড়েও। সমাজ যখন নির্বাক, আপনি উচ্চারণ করেছিলেন একা কন্ঠে।
যেখানে শ্রদ্ধা ছিল শুধুই অন্ধতা,কুসংস্কার - আপনি খুঁজেছিলেন প্রশ্নের ভিতর উত্তর। স্তব্ধ সময়ের বুকে দাঁড়িয়ে আপনি উচ্চারণ করেছিলেন:
"নারী এবং শিশুর অধিকার আছে শিক্ষা পাওয়ার।"

আপনার কলমে বর্ণপরিচয়ের শব্দ শুধু উচ্চারণ ছিল না তা ছিল এক যুগান্তকারী বিপ্লব, শিশুমনে যুক্তির প্রথম ছোঁয়া। যে কৌলীন্য কুঠুরিতে কাঁদতো নারী, আপনি সেখানে চন্দ্রের মতো আলো পাঠিয়েছেন। যে সমাজ দারিদ্রের কারনে কাঁদত, আপনি তাদের কান্না শুনেছিলেন উচ্চকণ্ঠে।

ঈশ্বরচন্দ্র—এই নামটি এক ব্যক্তির নয়, এ এক মহাকাব্য। যার প্রতিটি ছত্রে লেখা আছে মানবধর্মের মৌলিক শপথ। আজ, আপনার প্রয়াণবার্ষিকীতে জানাই শতকোটি প্রনাম। আজ আপনি নেই তবু আপনি আছেন প্রতিটি সাহসে, প্রতিটি বিদ্রোহে, প্রতিটি চোখে যার প্রতিবাদ জমে আছে আজও। 

যিনি ঈশ্বর হয়েও, ছিলেন শুধুই চন্দ্র—আলোকদাতা।

প্রণাম, দয়ার সাগর বিদ্যাসাগর। প্রয়ান বার্ষিকীতে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।


স্বপ্নদ্রষ্টা এক অগ্নিপুরুষ

 
আজ আমি এমন একটা মানুষকে নিয়ে লিখছি ,যাঁর আলোয় একটা গোটা জাতি পথ খুঁজে পেয়েছিল।‌ সেই আলোকবর্তিকাদের ভিড়ে এক নিঃশব্দ কিন্তু ধ্রুব জ্যোতিষ্কের মতো উদিত হয়েছিলেন ডঃ এ.পি.জে. আব্দুল কালাম। তাঁর জীবন ছিল এক সমুদ্র—যার তলদেশে যেমন বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, রাষ্ট্রনীতি, তেমনি ছিল প্রজ্ঞা, কাব্য ও করুণা। তিনি রাষ্ট্রপতি ছিলেন, কিন্তু রাষ্ট্রের চেয়ে বড় ছিলেন মানুষ হিসেবে। আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী। আমি তাঁকে যতটুকু চিনেছি, জেনেছি এবং তাঁকে বুঝেছি ততই আমি অভিভূত হয়েছি। তাঁর প্রত্যেকটা বানী আমাকে অনুপ্রেরনা জুগিয়েছে। আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে নিয়ে আমি দু-চার কথা না লিখে পারলাম না।

আমাদের সমাজে জন্ম আর আর্থিক অবস্থানকে আমরা ভবিষ্যতের একমাত্র নিয়ামক ভেবে নিই। কিন্তু কালাম স্যার বুঝিয়ে গেছেন—জন্মের স্থান নয়, মন ও স্বপ্নের গভীরতা নির্ধারণ করে জীবনের পরিধি। আমি বারবার ভাবি তিনি কী করে নিজের দারিদ্র্যকে পরিণত করল এক রাষ্ট্রের চেতনার প্রতীক হিসেবে? যখন দেখি তাঁর কাজকে শুধু অস্ত্রনীতির সাফল্য বলে অভিহিত করা হয়, তখন কষ্ট পাই। কালাম স্যার আমার কাছে একজন নির্মাতা, যিনি হাতিয়ার বানাতে জানতেন ঠিকই, কিন্তু তার চেয়েও ভালো জানতেন স্বপ্ন গড়ে তুলতে। ওঁনার কাছে 'উন্নয়ন' মানে ছিল আত্মনির্ভরতা, কিন্তু সেই আত্মনির্ভরতা যেন ছিল মানবিক মূল্যবোধে মোড়ানো। আজ যখন ধর্মের ভিত্তিতে মানুষ ভাগ হয়ে যায়, তখন কালাম স্যার যেন আমার কাছে এক জীবন্ত উত্তর—“মানুষ আগে, ধর্ম পরে।” আমি যখন বিভাজনের রাজনীতি দেখি, তখন মনে পড়ে, কালাম স্যার কোনো ধর্মের মুখপাত্র ছিলেন না, তিনি ছিলেন মানবধর্মের দূত। আজকের এই সময়ে, যখন আমরা প্রায়ই দেখতে পাই তরুণ প্রজন্ম আত্মবিশ্বাস হারাচ্ছে, ভেঙে পড়ছে চাকরি না পাওয়ার হতাশায়, অথবা সোশ্যাল মিডিয়ার কৃত্রিম প্রতিযোগিতায় নিজেদের হারিয়ে ফেলছে—তখন আব্দুল কালাম যেন দাঁড়িয়ে থাকেন এক নিঃশব্দ বাতিঘরের মতো। আমি মনে করি, কালামের জীবনদর্শন আমাদের শিখিয়েছে সফলতা শুধু পদ বা প্রাপ্তির নাম নয়, বরং এটা একটি মানসিক প্রস্তুতি, এক অন্তর্দৃষ্টি, যা বলে:- “তুমি পারো, যদি তুমি নিজেকে বিশ্বাস করো।” আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় দুর্যোগ হচ্ছে আমরা স্বপ্ন দেখিনা, বা স্বপ্ন দেখলেও নিজেকে তার উপযুক্ত ভাবিনা। কিন্তু কালাম বলতেন, "Dream is not that which you see while sleeping, it is something that does not let you sleep." আমার মতে, এই একটা বাক্যই আজকের শিক্ষা ব্যবস্থার পাঠ্যসূচিতে প্রথম পাতায় থাকা উচিত। তিনি কখনো অর্থ-প্রাপ্তিকে জীবনের একমাত্র পরিমাপক ভাবেননি। তাই তো আজকের এই কর্পোরেট-প্ররোচিত, নম্বর-নির্ভর, চাকরিনির্ভর সমাজে দাঁড়িয়েও আমি তাঁর কথাই মনে করি। ভাবি, কালাম স্যার যেন আমাদের বলেন—"মানুষ হও, পদ নয়; মনুষ্যত্ব অর্জন করো, মোহ নয়।"

প্রনাম এবং শ্রদ্ধা জানাই "দ্য মিসাইল ম্যান অফ ইন্ডিয়া" আভুল পাকির জয়নুলাবেদিন আবদুল কালাম।
ছবি :- সংগৃহিত 

১ টাকার ডাক্তারটা আজ আর নেই


১ টাকার ডাক্তারটা আজ আর নেই

তিনি কথা বলতেন খুব আস্তে। যেন শব্দ দিয়ে নয়, আশীর্বাদ দিয়ে কথা বলেন।তাঁর চোখে ছিল এক অপার ধৈর্য, যা শুধু সহানুভূতিতে তৈরি হয় না,তার পেছনে থাকে জীবনভর অনুশীলন। তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল একদিন,একটা সমাজসেবামূলক অনুষ্ঠানে। আমি গিয়েছিলাম আয়োজনের দায়ে, আর তিনি এসেছিলেন শুধু ভালোবাসার টানে। তাঁর সাদা পাঞ্জাবি, হাসিমাখা মুখ, আর সেই গলায় আলতো আশ্বাস এখনও মনে পড়ে, আর বুকের ভেতর হুহু করে ওঠে।
তাঁর কাছে গিয়ে আমি নাম জিজ্ঞেস করিনি। কারণ তাঁর চোখই বলে দিয়েছিল তিনি কে। মানুষকে সত্যিকারে ভালোবাসলে, কোনও পদবী, কোনও পরিচয় লাগে না। তিনি এমন একজন, যাঁর কাছে জীবন মানে ছিল দান নয়, দায়িত্ব। নিজের প্রাপ্যটুকু নিয়ে কখনও অভিযোগ করেননি, বরং অন্যের অপ্রাপ্তিকে নিজের করে নিয়েছিলেন। আজ যখন দেখি, চিকিৎসা মানে কোটির টাকার ব্যবসা, দরিদ্র রোগীর মুখ দেখলে বন্ধ হয়ে যায় ডাক্তারবাবুর চেম্বার, তখন খুব মনে পড়ে তাঁর কথা।যিনি একটা ছোট্ট ঘরে বসে শুধু ১ টাকায় মানুষের যন্ত্রণা লাঘব করতেন।না, এটা দয়া ছিল না। এটা ছিল বিশ্বাস যে চিকিৎসা একটা পেশা নয়, এটা এক মানবিক ব্রত।
আজ তিনি নেই।তবু কোথাও যেন আছেন। একটা দীর্ঘশ্বাসে, একটা রোগীর কপালে হাত রেখে বলা কথায়—“ভয় নেই, আমি আছি।” আমি জানি, তিনি ছিলেন না কোনো ঈশ্বর, তবু তাঁর উপস্থিতি ঈশ্বরেরই আশ্বাস দিত। 
এতক্ষণ যার কথা বললাম, যিনি আজ আর আমাদের মধ্যে নেই। তিন বছর আগে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান। আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী। তাঁর নাম একবার উচ্চারণ করতেই বুক ধুকপুক করে ওঠে।
 তিনি—
ডঃ সুশোভন বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রয়ান দিবসে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা 

মহানায়ক


মহানায়ক
কলমে দেবরাজ সাহা


বড়ো পর্দায় নক্ষত্র যে, নাম তার উত্তম কুমার,
চোখের চাউনিতে ভালোবাসা, হাসিতে রোদ্দুর-ধার।
ছবির ফ্রেমে স্বপ্ন গাঁথা, সংলাপে কাব্য ঝরে,
বাংলা ছবির গানে গানে, হৃদয় আজও ভরে।

সুট-কোটে ছিল রাজকীয়, ধুতি-পাঞ্জাবিতেও মান,
ভাষায় ছিল শুদ্ধ উচ্চারণ, অভিনয়ে ছায়া প্রাণ।
সুচিত্রার পাশে নায়ক যেন, ছায়াসঙ্গী জীবনের,
"সবার উপরে" যিনি থাকেন, আজও তিনি হৃদয়ঘরের।

সুচিত্রার পাশে ধরা পড়ে প্রেম, যেন মেঘের পাশে চাঁদের হাসি,
উত্তম ছিলেন না শুধু প্রেমিক, ছিলেন বাংলা ছবির স্বপ্নবাঁশি।
প্রতিটি দৃশ্য, প্রতিটি শব্দ, হয়ে উঠত অনুভবের ধ্বনি,
তাঁর মুখে “ভালোবাসি” মানে, অশ্রুর মতো চিরজীবন্ত বাণী।

স্বপ্নের রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন, সিনেমার মোহময় দ্বীপে,
প্রতিটি ফ্রেমে লিখে গেছেন, জীবনের আর্তি নিঃশব্দ নীড়ে।
নীরব চোখে নক্ষত্রহাসি, কথায় যেন কবিতা বাজে,
উত্তম নাম, স্বপ্নের মঞ্চে, যুগের মণি, আলোয় সাজে।

আজ তিনি নেই—তবু আছেন, আজও বুকে বাজে সেই গান,
"এই পথ যদি না শেষ হয়", চলেই যায় তাঁরই টানে প্রাণ।
নায়ক নয়, মহানায়ক—বাংলার হৃদয়ে রাজাধিরাজ,
উত্তম কুমার, চিরস্মরণীয়, এক বিস্ময়, এক শুভ সাজ।









আমি ছদ্মবেশী ভিখারি

 

আমি ছদ্মবেশী ভিখারি

সেদিন রাত্রে বর্ধমান ফিরছি। স্টেশনের এক ধারে হঠাৎ এক ব্যক্তি আমার নজরে আসে। দেখে মনে হলো ঐ ব্যক্তিটি উচ্চশিক্ষিত, তবে প্রথম থেকেই আমার ধারনাই সঠিক ছিল। ঐ ব্যক্তির কাছে যেতেই ওনার নাম আমি জিজ্ঞাসা করলাম, তবে তিনি সেভাবে কিছুই ওনার নাম এবং তার পরিচয় আমাকে জানালেন না, তবে তিনি আলতো স্বরে যেটা বললেন, সেটা শুনেই আমার পুরো শরীর শিউরে উঠলো। তিনি বললেন- "আমি ছদ্মবেশী ভিখারি"।

যাইহোক নিজের রুমে এসে বসলাম। বাইরে থেকে কেউ একজন আমাকে ডাকছেন সেই ভেবে আমি দরজা খুলতে গেছি। দেখলাম এক ব্যক্তি আমার দিকে একটি কাগজ এগিয়ে দিয়ে বললেন "সাহায্য করবেন বাবু"। কাগজটা না পড়তেই আমি ওনাকে ১০ টাকার একটি নোট দিলাম। তারপর ওনার মুখের দিকে তাকাতেই লক্ষ করলাম উনি কেমন একটা কৌতুহল নিয়ে ঐ ১০ টাকার নোটটি দেখছেন। আমি হেসে বললাম - "হা! হা! হা! , আরে, ঐ নোটটি আসল ,জাল নোট তোমাকে দিই নি"। ব্যক্তিটি আমার দিকে তাকিয়ে বললো - "কে বলেছে আপনাকে নোটটি আসল নাকি নকল সেটা দেখছি। আমি দেখছি অন্যকিছু। "
ব্যক্তিটির কথায় কোন কর্ণপাত করিনি। কারন আমি ভেবেছিলাম লোকটি পাগল। রাত্রে ডিনার সেরে শুয়েছি, হঠাৎ আমার সেই ব্যাক্তির কথা মাথায় আসে যাকে আমি স্টেশনে দেখেছিলাম, সেই ছদ্মবেশী ভিখারী টা। কিছুতেই একটা জিনিস আমি মেলাতে পারছিনা, ভিখারী তাও আবার ছদ্মবেশী?

সকালে ঘুম থেকে উঠে খবরের কাগজ নিয়ে আমি বসে আছি। সঙ্গে এককাপ চা ও আছে। আচমকা আমার নজরে একটি হেডলাইন চোখে পড়লো। যেখানে লেখা -" এক পুরুষের গলাকাটা দেহ উদ্ধার, পুরো শরীর জুড়ে লেখা আমি ছদ্মবেশী ভিখারি "পুরো খবরটি পড়ার পর নিজের মনকে শান্ত করতে পারিনি। ছুট্টে স্টেশনে সেই ছদ্মবেশী ভিখারি টার কাছে আমি পৌঁছায়, কিন্তু আমি তাকে স্টেশন চত্বরে কোত্থাও খুঁজে পাইনি। স্টেশনের বাইরে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছি, এমনি সময় আমি দেখতে পাই সেই ছদ্মবেশী ভিখারি টাকে। তবে তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে আজ বেজায় খুশি। আমি সমস্ত কিছু উপেক্ষা না করেই তার কাছে যায়। তার সাথে আলাপচারিতার জন্য তাকে ১০ টাকার একটি নোট দিলাম,সে টাকাটা পেয়েই নোটটি আসল নাকি নকল যাচাই করে নিলো। অবাকও হলাম, কারন, গতরাত্রেই এক ব্যক্তি এমনটাই করেছিলো। ঐ ভিখারি টাকে আমি বললাম তুমি নিজেকে ছদ্মবেশী ভিখারি কেন বলছো? সে আমার দিকে তাকালো কিন্তু কোন জবাব দিলোনা। কিছুতেই একটা জিনিস আমি মেলাতে পারছিনা, খবরের কাগজের শিরোনাম আর এই ছদ্মবেশী ভিখারির আসল নাম।

পরের দিন সকালে আমি ইউনিভার্সিটি যাবার জন্য রাস্তায় টোটো ধরবার জন্য দাঁড়িয়ে আছি। দূর থেকে দেখতে পাই সেই ছদ্মবেশী ভিখারি টাকে। এদিকে আমার মাথার মধ্যে হাজার ভাবনা আসছে যে এই ভিখারি টাই গতকাল খবরের কাগজে পড়া সেই ব্যক্তি কে খুন করেনি তো...।
যাইহোক,তার কাছে আমি পৌঁছায়, কিন্তূ আজ দেখছি সে মুখে কোন কথা বলছে না। রাস্তার লোকজন এর কাছে খবর পাই উনি নাকি বোবা। আমি আরো বেশি আশ্চর্য হয়ে পড়ি, কারন এই ব্যক্তি কে আমি গত দুদিন ধরে দেখছি আর সে আমার সাথে কথাও বলেছে , কিন্তূ আজ সে নাকি বোবা এটা আমি মেনে নিতে পারলাম না। আমি ঠিক করেছি আজ এই ব্যক্তি অর্থাৎ ছদ্মবেশী ভিখারিটার সাথেই সারাক্ষণ কাটাবো,তাও সবার আড়ালে। সারাটা সন্ধ্যে ঐ ভিখারি টা রাস্তার ধারেই ভিক্ষা করে কাটালো। রাত্রি গড়িয়ে আসে। বাজার প্রায় বন্ধের মুখেই। আমি আড়াল থেকে লক্ষ্য করলাম ঐ ভিখারি টা তার সমস্ত সরঞ্জাম নিয়ে এগিয়ে চলেছে। আমিও তার পিছনেই আছি,আর তাকে লক্ষ্য করছি। ঐ ভিখারি টা একটি অন্ধকার জলাশয়ের ধারে দাঁড়িয়ে আছে। আর হ্যাঁ ,এই জলাশয়ের বর্ননা আমি গতকাল খবরের কাগজে পড়েছিলাম যেখানে সেই গলাকাটা লাশের ঘটনা টি ছিল। আমি ভেবেছিলাম থানায় খবর দেবো। ফোনটা বাড় করতেই আমি দেখতে পেলাম ঐ ভিখারি টি চিৎকার করে হাসছে আর বলছে "আমি ছদ্মবেশী ভিখারি"। তবে এত ভয়ঙ্কর ঘটনা আমার সাথে এর আগে কখনো ঘটেনি।
আমি তার দিকে এগিয়ে গেলাম। তাকে কাঁধে হাত দিয়ে ডাকলাম। সে পিছন ঘুরে আমাকে দেখে আর বলে- " ও আপনি?"
আমি তাকে বললাম আপনি কথা বলতে পারেন? আর সকালে তো আমি শুনলাম যে আপনি নাকি কথা বলতে পারেন না। আপনি তো বোবা। ভিখারি টা হেসে উত্তর দিলো -"কে বলেছে আমি বোবা? আর আপনি এখানে কেন এসেছেন?" আমি তার কথার কোন উত্তর দিলাম না। শুধু জিজ্ঞাসা করলাম আপনার এরকম অবস্থা কেন?
ভিখারি টা বললো -"আজ থেকে প্রায় তিন বছর আগে আমি প্রাইভেট সেক্টরে একটি চাকরি করতাম। পরিবারের অবস্থা তেমন ভালো ছিল না। একদিন নিশুতি রাত্রে এই জলাশয়ের পাশ দিয়ে আমি বাড়ি ফিরছি। দেখলাম আমার স্ত্রী, মা ,ছোট বোন সকলেই এই জলাশয়ের ধারে পড়ে আছে। তাদের কে খুন করা হয়েছিলো। আমি প্রচন্ড ভেঙে পড়েছিলাম। কিছুতেই কারন অনুসন্ধান করতে পারিনি,যে কী কারনে তাদের কে খুন করা হয়েছে? আমি থানায় অভিযোগ দায়ের করার জন্য গেলেও পুলিশ আমাকে থানা থেকে বের করে দেন। কিন্তু আমি একটা সূত্র পেয়েছিলাম। আমার পরিবারের মৃতদেহের এক পাশে একটা ১০ টাকার নোট পড়ে থাকতে দেখি। "
আমি অবাক হয়ে বললাম- "১০ টাকার নোট?"
ভিখারি টা বললো -" হ্যাঁ ১০ টাকার নোট। আমি কাজে বেরোনোর আগে আমার ছোট বোন কে চকলেট কেনার জন্য ১০টাকা দিয়েছিলাম । কিন্তু ঐ ১০ টাকা নোটের ওপরে রক্ত দিয়ে লেখা আমি ছদ্মবেশী ভিখারি"।
হঠাৎ আমি একটা জোরালো আওয়াজ শুনতে পেলাম। চোখ খুলতেই দেখি সকাল হয়ে গেছে। আর জোরালো আওয়াজ টা ছিল আমার অ্যালার্ম ঘড়ির। এতক্ষণ যা ছিলো সবটুকু এক দুঃস্বপ্ন।
তবে এই ছদ্মবেশী ভিখারি টার কথা কি আমি আর কখনো জানতে পারবো না? কি ছিল তার পরিচয়? আর কেন তার পুরো পরিবার কে হত্যা করা হয়েছিলো সে সবটুকু কি আমার কাছে অজানা থেকে যাবে?
যাইহোক তবে আমার মনে থাকবে স্টেশনে এবং জলাশয়ের ধারে তার বলা কথা -

" আমি ছদ্মবেশী ভিখারি..."।

আমাকে আর খুঁজো না

 
তোমার মনে আছে?
সেই বিকেলটা—
যখন তুমি রেগে চলে গেলে, আর আমি কিছুই বলিনি।তোমার চলে যাওয়াটার কোন শব্দ ছিল না,শুধু হাওয়ায় ভেসে ছিল একগুচ্ছ কিছু না বলা কথা।সেইদিনের পর থেকে, আমি আর কিছুই সেরকম লিখিনি।
 কিন্তূ আজ লিখছি। 

হ্যাঁ, আমি সেই তুহিন ...
যার নামটা তুমি আর উচ্চারণ করো না আজকাল, শুধু আজ স্মৃতির পাতায় সেটা ঘোলাটে কালি হয়ে ছড়িয়ে আছে। আমি হারিয়ে যাইনি। আমি থাকি— সেইসব জায়গায়, যেখানে তুমি দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলো। তুমি বুঝেছো,এ কোনো আত্মহত্যা নয়,এ প্রেমের চূড়ান্ত পরিণতি। তবু প্রতি রাতে তুমি ঘুমোনোর আগে তাকাও জানালার বাইরে,
 যেখানে একফালি চাঁদ হেসে বলে—
“সে তো এখনো আছে, তোমার সমস্ত না বলা কথার ভেতরে…”
তবুও আমি আছি—
সেই গানটার মধ্যে —"তোমাকে বুঝিনা প্রিয়", যেটা শুনলে তোমার মনে পড়ে যেত, এটা আমার প্রিয় গান ছিল!
আমি আছি সেই পুরনো বারান্দার ধারে,
যেখানে বসে একদিন লিখেছিলাম “তোমাকে আমি খুঁজি প্রতিটি ক্যাফেটেরিয়াতে।” হয়ত লেখাটি তুমি পড়েছ।
তুমি আমায় খোঁজো, আমি জানি। রাত্রি যত গভীর হয়, তোমার খোঁজ ততই গভীর হয়।
কিন্তু এখন…
আমাকে আর খুঁজো না।
কারণ আমি এখন আর খুঁজে পাবো না তোমায়, আমার মধ্যেও তুমি আজ কুয়াশার মতো ঝাপসা। তবু যদি কখনও কারও চোখে আমায় চিনে ফেলো,
যদি কোনো কবিতার লাইনে আমার নাম ধরে ফেলো তখন শুধু চুপটি করে হাসবে, আর ভাববে— এই নীরবতাটাই বোধহয় শেষ ভালোবাসা ছিল। 
আমি জানি, আমরা আর একসঙ্গে থাকি না, তবু ভালোবাসাটা কোথাও ঠিক রয়ে গেছে সময়ের একটা বন্ধ ঘরে, যার দরজায় লেখা— 

আমাকে আর খুঁজো না।”
ছবি - সংগৃহিত


চাকা ঘোরে রথের, হৃদয় কি ঘোরে? উৎসব রইল রাস্তায়, ঈশ্বর চুপ অন্তরে

 
"চাকা ঘোরে রথের, হৃদয় কি ঘোরে?
 উৎসব রইল রাস্তায়, ঈশ্বর চুপ অন্তরে"

আমার মনে হয়, আজকের রথযাত্রা যেন দাঁড়িয়ে আছে দুটি পথের সন্ধিক্ষণে। একদিকে প্রযুক্তির দীপ্তি, যেখানে ঈশ্বরের পথে পা ফেলছি না, বরং ক্যামেরার ফোকাসে তাঁকে বন্দি করছি এবং অন্যদিকে বিশ্বাসের ধূসর স্নিগ্ধতা। ধর্ম ও রাজনীতির সীমারেখা ঘোলাটে। আর এসবের মধ্যে দাঁড়িয়ে আমরা- ভক্ত নই, পর্যবেক্ষক। আর রথের মতো শান্তি ও সমতার প্রতীক যদি হয়ে যায় দখলের প্রতিযোগিতা, তবে আমরা কেবল ঈশ্বরকে নয়, নিজের বিবেককেও বিসর্জন দিচ্ছি  — লিখেছেন দেবরাজ সাহা 


রথের চাকা ঘুরছে। বহমান, অনবরত। কিন্তু সেই গতির গভীরে আমরা কী শুনি? ভক্তির ধ্বনি, না এক বিবশ বিনোদনের ব্যস্ত শব্দ? এক সময় রথ মানে ছিল আকাশে মেঘ, জমির ধুলো, মানুষের ঢল আর অন্তরের আবেগ। কাঁধে বল, কপালে ঘাম, গলায় জয়ধ্বনি। আর আজ সেই কাঁধে ক্যামেরা ঝুলছে, সেলফি স্টিকে ঈশ্বর আটকে আছেন। ভক্তি এখন ‘লাইভ’এ। দর্শন নয়, সম্প্রচার। মন নয়, মোবাইল অন। আমার শৈশবে, রথ মানে ছিল কাগজে রং করে বানানো রথ। পাড়ার বুড়ো ঠাকুরমা বলতেন, “জগন্নাথ আজ রথে উঠেছেন, তোদের জীবনেও শুভ সূচনা হোক।” সেইসব কথা আজ আর শোনা যায় না। এখন শোনা যায়, “লাইভটা ঠিক মতো হচ্ছে তো?” অথবা, “ফলোয়ার বাড়ছে তো?” ঈশ্বর যেন সামাজিক মাধ্যমের একটি ফিচার হয়ে গিয়েছেন যিনি মানুষ নয়, কন্টেন্ট। একসময় রথ মানে ছিল আবেগ, বাড়ির ছোট্ট বেদিতে কাঠের রথে বসা ঠাকুরকে ভোগ দেওয়া,আর ঠাকুরমশাইয়ের মুখে শুনে আসা পদাবলী। আজ রথ মানে মেলা, শপিং, ঝলমলে ডিজে সাউন্ডে ঢেকে যাওয়া পুরোনো গান। রথ মানে 'সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা', যেখানে ঈশ্বরের নাম ডুবে যায় সাউন্ড মিক্সারে। 
আমার মতে, এটা আমাদের অন্তরের বিপর্যয়। ঈশ্বরকে আজ আমরা দেখাতে চাই, অনুভব করতে চাই না। আমরা তাঁর ছবি তুলতে চাই, সান্নিধ্যে থাকতে চাই না। আমরা রিল বানাই, কিন্তু রূপান্তর হই না। তবে প্রযুক্তির গরিমা আমি অস্বীকার করি না। এই প্রযুক্তিই আজ পৌঁছে দিচ্ছে রথের স্পর্শ সেই সব মানুষদের কাছে যারা শারীরিকভাবে বা ভৌগোলিকভাবে উপস্থিত থাকতে পারেন না। বৃদ্ধ, অসুস্থ, প্রবাসী তাঁরা অন্তত স্ক্রিনে দর্শন পান। কিন্তু প্রশ্ন থাকে দর্শন কি অনুভবের সমান? মায়ের কোলে ঘুমানোর যে উষ্ণতা, তা কি ফোনে দেখা মায়ের ছবিতে থাকে? ঠিক তেমনই, রথ যদি অনুভব না হয়, তাহলে তা নিছকই দৃশ্য, অনুভবহীন একটি দৃশ্য। 
আজকের ডিজিটাল রথের দৌলতে ফুটে উঠছে এক অস্বস্তিকর প্রতিচ্ছবি।একদিকে আলোকিত রথ, অন্যদিকে অন্ধকারে ঢেকে থাকা সমাজচেতনা। যখন রথের গায়ে রং-বেরঙের আলোকসজ্জা, তখন পাশের গ্রামে এক রোগী রক্তের অভাবে বা ডাক্তারের অভাবে মারা যাচ্ছেন। রথ মঞ্চে রাজনীতিকদের মুখ দেখা যায়, কিন্তু মানুষের চোখে নেই স্বস্তি। রাজনৈতিক নেতারা এসে বলছেন “ভগবানের আশীর্বাদে আজ আমরা এখানে”- কিন্তু প্রার্থনায় রাজনীতি ঢুকে গেলে তা আর প্রার্থনা থাকে না, হয়ে ওঠে প্রতারণা। রথের দিনে যখন ভক্তরা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন ভগবান দর্শন করবার জন্য, তখন মন্দিরের পাশে আলাদাভাবে থাকে VIP লাইন, তাছাড়াও ঠাকুরের চেয়েও বড় হয় ফ্লেক্সে ছাপানো রাজনীতিকের মুখ। এটাই আজকের সমাজের বাস্তব চিত্র। ধর্ম ও রাজনীতির সীমারেখা ঘোলাটে। ঈশ্বরের নামে মিছিল হয়, ট্রেন বন্ধ হয়, প্রাচীন রথকে ঘিরে শুরু হয় মেরুকরণ। রথ হয়ে ওঠে ক্ষমতা প্রদর্শনের অজুহাত।ধর্ম যখন রাজনীতির হাত ধরে চলে, তখন তা ভক্তির বাহন নয়, বিভেদের যন্ত্র হয়ে ওঠে। আর রথের মতো শান্তি ও সমতার প্রতীক যদি হয়ে যায় দখলের প্রতিযোগিতা, তবে আমরা কেবল ঈশ্বরকে নয়, নিজের বিবেককেও বিসর্জন দিচ্ছি। ধর্মের নামে উল্লাস আর ভোটের নামে হুজুগ; এই দুইয়ের মধ্যবর্তী রথে ঈশ্বর আর থাকেন না, থাকেন শুধু ব্যালটের সম্ভাবনা। 
আমি বিশ্বাস করি, ঈশ্বরকে সত্যিই অনুভব করতে হলে চোখ নয়, হৃদয় দরকার। আর সেই হৃদয় আজ যেন হারিয়ে যাচ্ছে ক্যামেরার লেন্সে। আমরা ঈশ্বরের পথের সঙ্গী হচ্ছি না, বরং তাঁকে পর্যবেক্ষণের বস্তুতে রূপান্তর করছি। তবু আমি বলব, প্রযুক্তির সবটুকু মন্দ নয়। এটা একটা আয়না। সে আমাদের দেখায় আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে। কিন্তু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমরা কি শুধুই মুখ ঠিক করি? না কি চোখে চোখ রেখে দেখি নিজের অন্তর? এই প্রশ্নই রথযাত্রার দিন আমাদের করা দরকার। আজ যখন আমরা ডিজিটাল ক্যামেরা হাতে রথ দেখতে যাই, তখন নিজেকেই জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয় রথের আসল দর্শনার্থী কে? আমি, না আমার মোবাইল ফোন? রথ মানে তো কেবল উল্লাস নয়। রথ মানে পথ। রথ মানে চলা। সেই চলার সাথী হওয়া মানে ঈশ্বরের কাছে পৌঁছানো নয়, বরং তাঁর মতো করে মানুষের পাশে দাঁড়ানো। যদি রথযাত্রা আমাদের শুধু বাহ্যিক উৎসবে সীমাবদ্ধ রাখে, তাহলে সেটি ধর্ম নয়, হুজুগ। আর যদি রথ আমাদের ভিতরের রথচক্র ঘোরাতে শেখায়—তাহলে সেই রথই সত্যিকারের উৎসব। আমার মনে হয়, আজ আমাদের ঈশ্বরকে দরকার নিজের ভেতরের রথে বসিয়ে তোলার। উৎসব শুধু রাস্তায় নয়, সে যেন ঘটে আত্মার আঙিনায়। যদি তা না হয়, তবে রথ থাকবে, কিন্তু যাত্রা হবে না। আর ঈশ্বরের এর চেয়ে দুঃখের কিছু নেই, যদি তাঁকে বসিয়ে রাখা হয় একা এক নিঃসঙ্গ রথে। প্রযুক্তি খুব ভালো, কিন্তু সে যেন ঈশ্বরের প্রতীক না হয়ে ওঠে। ঈশ্বর যিনি অনুভবের বস্তু, তাঁকে যদি আমরা শিখরে বসিয়ে রিল বানানোর অস্ত্র করে ফেলি, তাহলে তাঁকে আমরা খুইয়ে ফেলি। ঈশ্বর তখন আর আমাদের হৃদয়ে থাকেন না, থাকেন ট্রেন্ডিং ট্যাগে। 

আমার বিশ্বাস, ঈশ্বরের রথ যতটা না পথচলার প্রতীক, তার চেয়েও বেশি এক আত্মজাগরণের আহ্বান। রথ টানার শক্তি শুধু বাহুতে নয়, লাগে বিবেকেও। আর সেই বিবেক আজ যেন ক্রমেই মঞ্চ, মিডিয়া আর মিথ্যের ভিড়ে নিঃশব্দ হয়ে যাচ্ছে। আমি বলি, প্রযুক্তি থাকুক, জৌলুস থাকুক, তবু ঈশ্বর যেন অন্তরেই থাকেন। তাঁকে যেন আমরা ব্যবহার না করি, বরং উপলব্ধি করি। যদি আমরা সত্যিই চাই ঈশ্বরকে কাছে পাবার, তবে আমাদের হৃদয়টাও প্রস্তুত করতে হবে ভক্তির, বিনয়ের, প্রশ্নের এবং প্রতিরোধের মাটি দিয়ে। কারণ ঈশ্বর কেবল রথে বসেন না, তিনি বসেন সেই মনেও, যেখানে মানুষকে মানুষ ভাবার সাহস এখনও বেঁচে আছে। আর আমি সেই সাহসকেই ঈশ্বর বলে জানি।

তারিখ:- ২৭.০৬.২০২৫

আমি বেশ্যার মেয়ে


আমি বেশ্যার মেয়ে

রূপার জন্ম সোনাগাছির এক গুমোট রাতে, যখন ঘুঙরুর শব্দ আর সস্তা সুরার গন্ধে বাতাস ভারী ছিল। তার মা চম্পা, এককালে প্রেমে পড়ে ঘর ছেড়েছিল, পরে ফিরে এসেছিল ভাঙা শরীর আর ভাঙা মন নিয়ে। সোনাগাছির দালাল তাকে বলেছিল, “যা ভেঙেছে, তা-ই এবার চালাও।” সেই পাঁকেই জন্ম রূপার।
 সমাজ রূপাকে ‘বেশ্যার মেয়ে’ বলে ছিঁড়ে খেয়েছে। 

রূপা প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে পায় কলমে। রূপার শব্দগুলো রূপ পায় অস্ত্রে। কলেজে সে চুপিচুপি প্রেমে পড়ে অর্কর, কিন্তু সত্য জানতে পারার পর অর্কও পিছিয়ে যায়। তখনই রূপা বুঝে, সে আর কেবল প্রেমে নয়—প্রতিবাদেই বাঁচবে।

তার কলেজের এক ছাত্রীর ধর্ষণের ঘটনায় সে দাঁড়ায়—প্ল্যাকার্ড হাতে, গলায় আগুন। সবাই চমকে যায়—“সোনাগাছির মেয়ে এখন মুখ খুলেছে!” রূপা বলে, “আমরা শুধু শরীর নই, প্রতিবাদের শরীর।”
একদিন রূপা যখন দরজা খুলে ঘরে ঢুকল, চম্পা বলে উঠল,
— “আজকাল তুই ঘরে কম আসিস। তুই এখন বড়লোক হইছিস না?”
 চম্পা বলেছিল, কিভাবে সতেরো বছর বয়সে এক গার্মেন্টস শ্রমিকের প্রেমে পড়ে তার সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছিল। তারপর ভগ্ন গর্ভে ফিরেছিল শহরে। — “আমি কাউকে দোষ দিই না রূপা। কিন্তু নিজের শরীর যখন বিক্রি করতে শুরু করলাম, তখন প্রতিদিন একটু করে মরে গেছি।” রূপা বলেছিল,
— “তুই মরিসনি মা। তুই আমাকে বাঁচিয়েছিস। তুই নিজের দেহ হারিয়ে আমার আত্মা রক্ষা করেছিস।” 
এভাবেই বেশ কিছুদিন কেটে যায় চম্পা ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হয়। হাসপাতালে ভর্তি করতে চেয়েছিল রূপা, কিন্তু চম্পা বলেছিল,
— “না রে, আমি গন্ধবাজারেই মরতে চাই। এখানেই আমার জীবন গেছে, এখানেই আমার মৃত্যু হোক।” রূপা বোঝে, মৃত্যুর চেয়ে জায়গার স্বীকৃতিই বড় হয়ে উঠেছে তার মায়ের কাছে।
একদিন সকালে রূপা তার কপালে হাত রেখে দেখল—চম্পা চোখ খুলে আছে, কিন্তু ঠোঁটে একরাশ প্রশান্তি।
তবে হঠাৎ সে ফিসফিসিয়ে বলল, — “আমার মুখটা ঢেকে দিস না রূপা। আমি চাই সবাই দেখুক, এই মুখ কেমন ছিল যে সমাজ এতটা ঘৃণা করত।” 
সেই মৃত্যুই যেন রূপার জীবনের সবচেয়ে বড় দায় হয়ে উঠল।
এর কিছুদিন পর, রূপা প্রতিষ্ঠা করল এক সংগঠন—“স্বরজ”।
নাম রাখল মায়ের স্মৃতিতে—স্বর আর মুক্তির মিলনস্থল।
সেখানে যৌনপল্লির মেয়েরা পড়াশোনা করে, আত্মরক্ষার ক্লাস নেয়, শিল্প শেখে, কবিতা লেখে। 
এভাবেই বেশ কিছুদিন কেটে যায়। এক সন্ধ্যায়, এক মঞ্চে দাঁড়িয়ে রূপা উচ্চারণ করেছিল তার জীবনের সারাংশ—
“আমি বেশ্যার মেয়ে। এই সমাজে এই পরিচয়টা গালি।আমি সেই গালিকে গর্ব বানিয়েছি। আমি কেবল আমার শরীর নয়, আমার ইতিহাস নিয়েও দাঁড়িয়েছি।”

যেখানে রূপা এই বক্তৃতা দিয়েছিলো সেই হল জুড়ে তখন নীরবতা। তারপর করতালি। তবে রূপার চোখে শুধু চম্পার মুখ কোনো রক্তমাংসের নয়, এক তেজস্বী ছায়ার মুখ, যে তার বুকের ভেতর থেকে বলে উঠছে— 
“তুই পেরেছিস, রূপা। তুই সত্যিই পেরেছিস।”

সম্পর্ক

 

সম্পর্ক
দেবরাজ সাহা

তুমি বাতাস,
আমি পাতা।
তুমি না থাকলে,
আমি নড়ব না।

তবু কখনো,
তুমি দেখতে পাও না,
আমি কোথায় আছি।

নীরবে ঝরে পড়ি...
তোমারই খোঁজে।

তোমাকে আমি খুঁজি প্রতিটি ক্যাফেটেরিয়াতে

 

তোমাকে আমি খুঁজি প্রতিটি ক্যাফেটেরিয়াতে


তুমি চলে যাওয়ার পর শহরটা বদলায়নি, কিন্তু প্রতিটি কোণা যেন একটু করে ফাঁকা হয়ে গেছে। তুমি ছিলে বলেই হয়তো জানালার পাশে বসা মানে ছিল একরকম ঘরবন্দি ভালোবাসা। এখন সেই জানালার পাশের চেয়ারটা শুধু হাওয়ায় দোলে, কিন্তু আমি আর তাকাই না। তোমাকে আমি খুঁজি সেই চেনা চশমার ফ্রেমের পিছনে লুকিয়ে থাকা দুটো না বলা কথায়, যা একদিন আমাকে নিরবে বলে দিয়েছিল

—‌ থেকে যেও...

 তবু আমি বুঝিনি, হয়তো বোঝার অভিনয় করেছিলাম। 

তোমাকে আমি খুঁজি প্রতিটি ক্যাফেটেরিয়াতে।
কারণ আমি জানি, একদিন যদি তুমি ফিরে আসো—এখানেই আসবে। এক কাপ কফি নেবে, জানালার ধারে বসবে, আর মুচকি হেসে বলবে,

— তুমি এখনও বসে আছো?

আর আমি বলব,

— এই চেয়ারটা তো কখনও খালি হয়নি। 

তুমি তো শুধু চলে যাওনি। তুমি রেখে গেছো হাজারটা অভ্যেস, যেগুলো আমি আজও ত্যাগ করতে পারিনি। তোমার চলে যাওয়ার দিনে বাজছিল যে গানটা, সেটি প্রতিবার ক্যাফের স্পিকারে শুনলেই আমি নিঃশব্দে কাঁদি। হ্যাঁ, তোমাকে আমি আজও খুঁজি প্রতিটি ক্যাফেটেরিয়াতে। এ শুধু একদিনের অভ্যাস নয়, এ আমার সমস্ত জীবনের প্রেম। এক অসমাপ্ত ভালোবাসা। এক কাপ; একতরফা কফি।

একদিন এই ক্যাফেতেই বসে ছিলাম। অফিসপাড়া খালি হয়ে আসছিল। ঠিক তখন এক মেয়ে দরজা ঠেলে ঢুকল—চুলটা বাঁধা, চোখে হালকা কাজল। মনে হলো মেয়েটি তুমি। হৃদয়টা একটু হলেও থমকে গেছিল। কিন্তু সে যখন পাশের টেবিলে গিয়ে বসল, আমি বুঝলাম, ভুল করলাম—আবার।  আজকাল আর এই ক্যাফেতে যাওয়া হয় না, আসলে যেতে ইচ্ছে হয় না।

আমি জানি, তুমি আর কখনোই এখানে আসবে না। 

তবু, তবু— 
'তোমাকে আমি খুঁজি প্রতিটি ক্যাফেটেরিয়াতে।'

জামাইষষ্ঠী নিয়ে দুচার কথা, লিখেছি নয়াজামানা পত্রিকায়

নয়া জামানা পত্রিকা

একটু দাঁড়িয়ে যাবি ?


 
লেখক :- দেবরাজ সাহা 

ছেলেটির নাম মৈনাক, মেয়েটি অন্বেষা।
তিন নম্বর বাসে রোজ একসঙ্গে স্কুলে যাওয়া, একই টিউশনে বসে মাথা গোঁজার নাম করে চোখাচোখি, আর সন্ধ্যেবেলায় বাড়ির পাশে কুমোরটুলির গলিতে দাঁড়িয়ে থাকা—এই ছিল ওদের প্রেমের সবটা পৃথিবী।

অন্বেষা খুব হাসত, মৈনাক বলত, “তোর হাসিটাই আমার প্রিয় ঋতু।”
একদিন, এক শীতে, মৈনাক চুপচাপ হাতে একটা ছোট ফুল এনে বলেছিল,
“তুই চুলে পরবি এটা?”
অন্বেষা একটু লাজুক হয়ে বলেছিল,
“সবাই দেখবে তো…”
মৈনাক বলেছিল,
“তাহলে চোখ বন্ধ কর, আমি গুঁজে দিচ্ছি।”

ছবিটা সেই মুহূর্তের। সেই এক চিলতে স্বপ্নের।

এর কিছুদিন পরেই মৈনাক এর মা মারা যায়। আর্থিক চাপ, সংসারের হাল ধরতে সে আর কলেজে ভর্তি হতে পারেনি। সব শেষে একটা ফার্মেসিতে কাজ নেয়।
অন্বেষা ডাক্তারি পরীক্ষায় পাশ করে, কলকাতা চলে যায়।

সেই যে গেল, আর ফিরল কই?

মেসেঞ্জারে কিছুদিন যোগাযোগ ছিল। তারপর ধীরে ধীরে উত্তর আসা বন্ধ। মৈনাক বুঝে গিয়েছিল—অন্বেষার জীবনের গতি অনেক দূরে চলে গেছে।
কিন্তু মৈনাক কখনোই রাগ করেনি। কষ্টও হয়নি খুব একটা। শুধু মাঝে মাঝে কুমোরটুলির গলি দিয়ে গেলে একটু থেমে দাঁড়ায়।
একদিন বন্ধুকে বলেছিল,
“জানিস, ও একদিন বলেছিল—‘তুই একটা ফুল গুঁজে দিলে আমি চিরকাল সেটা রেখে দেব’।”
বন্ধু অবাক হয়ে বলেছিল,
“তুই তো জানিস, এখন ওর বিয়ের কথা চলছে, ও তো তোকে ভুলেই গেছে।”
মৈনাক মাথা নিচু করে হেসেছিল। বলেছিল,
“আমার কাছে ভালোবাসা মানে ওর মনে থাকা নয়,
ভালোবাসা মানে—ওর মাথায় এখনো একটা ফুল গোঁজা আছে কি না, সেটা ভাববার সুযোগ রাখা।”

অনেক বছর পর কলকাতার এক মেডিকেল কনফারেন্সে অন্বেষা দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিচ্ছিল। ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ চোখে পড়ল একটা চেনা মুখ—পিছন সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা এক যুবক, সাধারণ পোশাকে, মুখে সেই পুরনো হাসি।

অন্বেষার চোখ ভিজে গিয়েছিল।  বক্তৃতা শেষ করে ছুটে গিয়েছিল।
কিন্তু মৈনাক তখন আর নেই।
শুধু চেয়ারটায় রাখা ছিল একটা খাম।
তার ভিতরে লেখা—

"তুই একদিন বলেছিলি, ‘একটু দাঁড়িয়ে যাবি?’
আমি দাঁড়িয়ে গেছিলাম।
আজ যাচ্ছি।
তোর পথ অনেক বড়, আমার পথ এখানেই ফুরোল।
শুভ হোক তোর জীবন,
—মৈনাক”

অন্বেষা সেদিন বুঝেছিল—সব ভালোবাসার গল্প বিয়েতে শেষ হয় না। কিছু গল্প কেবল এক মুহূর্তে জন্মায়, আর চিরকাল একটা গলির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকে।
শুধু একটিবার দেখা হয়ে গেলে... হয়তো সবটাই বদলে যেত।

শেষ নয়, কখনও শেষ হয় না। কিছু ভালোবাসা স্রেফ বেঁচে থাকে… এক মুহূর্তের মতো। একটা ফুলের মতো। “একটু দাঁড়িয়ে যাবি?” এই প্রশ্নের মতো।