আমি নন্দিনীকে কোনোদিন দেখিনি। তার সঙ্গে আমার কোনো পরিচয়ও নেই। তবু মাঝে মাঝে মনে হয়, আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা হাজারো মুখের ভিড়ে নন্দিনীর মতো কারও না কারও সঙ্গে প্রতিদিন দেখা হয়েই যায়।
নন্দিনী এক নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়ে। গ্রামের বাইরে একটি স্টেশনের ধারে তার বাবার একটি ছোট্ট দোকান ছিল। দোকান বলতে খুব বেশি কিছু নয়। ট্রেন থামলে যাত্রীরা দু-এক কাপ চা খেতেন, কেউ বিস্কুট কিনতেন, কেউ আবার শুধু একটু গল্প করে চলে যেতেন। সেই সামান্য আয়ের ওপরই দাঁড়িয়ে ছিল একটি সংসার। হিসেব ছিল ছোট। কিন্তু স্বপ্ন? স্বপ্ন ছিল অনেক বড়।
নন্দিনী সদ্য উচ্চমাধ্যমিক পাস করেছে। ফলও বেশ ভালোই। তার ইচ্ছে ছিল ডাক্তার হবে। ছোটবেলা থেকেই অসুস্থ মানুষদের দেখলে তার মন কেমন করে উঠত। গ্রামের অনেক মানুষ অর্থের অভাবে কিংবা চিকিৎসকের অভাবে ঠিকমতো চিকিৎসা পেতেন না। কারও জ্বর সপ্তাহের পর সপ্তাহ চলত, কেউ আবার হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই হাল ছেড়ে দিতেন অর্থের অভাবে।
এসব দেখেই নন্দিনী ভাবত—
“একদিন আমি ডাক্তার হব। এমন একজন ডাক্তার, যার দরজা কারও জন্য বন্ধ থাকবে না।”
তার বাবা প্রায়ই বলতেন —
“ নন্দিনী, আমি তোকে পড়াশোনা শেখাব। বড়ো ডাক্তার বানাব। তোকে মানুষের মতো মানুষ করব। তুই শুধু লড়াইটা চালিয়ে যা।”
আমি জানি না, একজন বাবার মুখে উচ্চারিত এই কথাগুলোর ওজন কতটা। তবে এটুকু জানি, নিম্নবিত্ত মানুষের স্বপ্নের ভেতর সবচেয়ে বেশি মিশে থাকে ত্যাগের গন্ধ। কিন্তু জীবন সবসময় মানুষের স্বপ্নের পাশে দাঁড়ায় না। সরকার থেকে ঘোষণা হল স্টেশন চত্বর নতুন করে সাজানো হবে। অবৈধ দখল সরাতে প্রশাসন অভিযান চালাবে। শহরকে আরও আধুনিক, আরও সুন্দর করে তোলার পরিকল্পনা হয়েছে। পরিকল্পনা সত্যিই বাস্তবায়িত হলো। বুলডোজার এল। মানচিত্র বদলাতে শুরু করল। কিন্তু মানচিত্র বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে কিছু মানুষের জীবনও বদলে গেল। যে দোকানগুলো বছরের পর বছর স্টেশনের ধারে দাঁড়িয়ে ছিল, সেগুলো একে একে ভেঙে ফেলা হলো। কারও ব্যবসা উঠে গেল, কারও রুজিরুটি হারিয়ে গেল। নন্দিনীর বাবার সেই ছোট্ট দোকানটাও রক্ষা পেল না। যে দোকানের কাঠের বেঞ্চে বসে কত মানুষ চা খেয়েছে, যে দোকানের আয় দিয়ে নন্দিনীর বই কেনা হয়েছে, যে দোকানের স্বপ্নে ভর করেই একটি পরিবার বেঁচে ছিল সেটা কয়েক মিনিটের মধ্যেই ধুলোয় মিশে গেল। সেদিন সন্ধ্যায় নন্দিনীর বাবা বাড়ি ফিরেছিলেন খালি হাতে। কোনো বাজারের থলে ছিল না।শুধু একরাশ নীরবতা ছিল।
নন্দিনীর মা ধীরে জিজ্ঞেস করেছিলেন—
“আজ কিছু আনোনি?”
তিনি উত্তর দেননি। কখনও কখনও মানুষের নীরবতাই সবচেয়ে বড় উত্তর হয়ে ওঠে। সেদিনই রাত্রে নন্দিনী বই খুলে বসেছিল ঠিকই। কিন্তু একটি লাইনও পড়তে পারেনি। চোখের সামনে শুধু ভেসে উঠছিল তার বাবার মুখ।
কয়েকদিন পরে সে বাবাকে বলতে শুনল —
“এবার হয়তো পড়াশোনাটা একটু থামাতে হবে... সংসারটা আগে সামলাতে হবে।”
‘একটু’। শব্দটা খুব ছোট্ট। কিন্তু নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনে এই ‘একটু’ শব্দটাই অনেক সময় আজীবনের দূরত্ব হয়ে দাঁড়ায়। আর সেই ‘একটু’ কখন যে কয়েক বছর হয়ে যায়, কেউ বুঝতেই পারে না।
নন্দিনী কিছু বলেনি। শুধু জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দূরে ছুটে যাওয়া ট্রেনগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল। তারপর শুরু হলো অন্য লড়াই। ভোরবেলা কয়েকজন ছাত্রছাত্রীকে পড়ানো। দুপুরে লাইব্রেরিতে বসে নিজের পড়াশোনা। রাতে স্থানীয় ওষুধের দোকানে হিসেব লেখা। পুরোনো বই কিনে পড়া। ফ্রি অনলাইন ক্লাস দেখা। ফর্ম ফিল-আপের টাকা জোগাড় করতে নিজের কিছু প্রিয় বই পর্যন্ত বিক্রি করে দেওয়া। তার সংগ্রামের গল্পে কোনো নাটকীয়তা ছিল না। কেউ তাকে সাহায্যের জন্য হাত বাড়ায়নি। কেউ তাকে সংবাদপত্রের শিরোনামও বানায়নি।
বরং অনেকেই বলেছিল—
“এত কষ্ট করে লাভ কী?”, “বাস্তবটা মেনে নিতে শেখো।”, “ডাক্তারি সবার জন্য নয়।”
নন্দিনী এসব শুনে কোন উত্তর দেয় নি। কারণ সে বুঝে গিয়েছিল, দারিদ্র্য শুধু মানুষের পকেট খালি করে না; দারিদ্র্য প্রথমে মানুষের কল্পনাশক্তিকে হত্যা করে। যেদিন মানুষ স্বপ্ন দেখা বন্ধ করে দেয়, সেদিনই লড়াইটা থেমে যায়।
নন্দিনী তার জীবনের প্রতিটি দিন, প্রতিটি কষ্ট, প্রতিটি না-পাওয়ার গল্প ডায়েরির পাতায় লিখে রাখত। সেদিনও লিখেছিল। তবে সেদিনের লেখায় ছিল প্রশ্ন, ক্ষোভ আর এক অদৃশ্য প্রতিবাদ।
সে লিখেছিল—
“হ্যাঁ, রেলের জমি দখল করে দোকান বসানো আইনসঙ্গত নয়, আমি তা জানি। রাষ্ট্রের আইন আছে, নিয়ম আছে, উন্নয়নের পরিকল্পনাও আছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন যে মানুষটা বিশ বছর ধরে ওই দোকানের আয় দিয়ে সংসার চালিয়েছে, মেয়ের বই কিনেছে, করজোড়ে বেঁচে থাকার অধিকারটুকু চেয়েছে, তার জন্য কি কোনো পরিকল্পনা ছিল? বুলডোজার আসার আগে কি কেউ একবারও জিজ্ঞেস করেছিল— এরপর তুমি বাঁচবে কীভাবে? উন্নয়ন যদি মানুষের জীবনকে আরও সুন্দর করার নাম হয়, তাহলে কিছু মানুষের পেটের ভাত কেড়ে নিয়ে সেই উন্নয়নের উৎসব কাদের জন্য? আমার বাবার দোকানটা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। হয়তো আইনের চোখে সেটাই ঠিক। কিন্তু আইন কি কখনও সেই চোখের জল দেখে, যা দোকানের ভাঙা টিনের নিচে চাপা পড়ে যায়? রাষ্ট্রের কাছে আমার কোনো অভিযোগ নেই। শুধু একটা প্রশ্ন আছে—মানচিত্র বদলানোর সময় কি মানুষের জীবনটাকেও একটু দেখে নেওয়া যেত না?”
তারপর কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে নন্দিনী ডায়েরির শেষ পাতায় লিখেছিল—
“আমার বাবার দোকান সরকার ভেঙে দিয়েছে। কিন্তু আমার ভেতরের দোকানটা এখনও খোলা আছে। সেখানে স্বপ্ন বিক্রি হয় না, সেখানে স্বপ্ন জমা রাখা হয়। আর যতদিন সেই দোকান খোলা থাকবে, ততদিন কোনো বুলডোজার আমার ভবিষ্যৎ ভাঙতে পারবে না।”
তারপর?
তারপর কী হয়েছিল, আমি জানি না। নন্দিনী ডাক্তার হয়েছিল কি না, সেটাও আমার জানা নেই। হয়তো হয়েছে। হয়তোবা হয়নি। কিন্তু সত্যি বলতে কী, এই গল্পের শেষটা আমি ইচ্ছে করেই করিনি। গল্পের শেষটা আমার কাছে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণও নয়। কারণ এই গল্প সাফল্যের গল্প নয়। এই গল্প সেইসব মানুষের গল্প, যারা বারবার পড়ে গিয়েও উঠে দাঁড়াতে জানে। এই গল্প সেইসব বাবার গল্প, যারা নিজের ক্ষুধা লুকিয়ে সন্তানের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখে। এই গল্প সেইসব ছেলে-মেয়ের গল্প, যারা দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করেও নিজের স্বপ্নের কাছে আত্মসমর্পণ করে না। আজও হয়তো কোথাও কোনো নন্দিনী পড়ছে। কোনো লাইব্রেরির কোণে। কোনো টিউশনি শেষ করে। কোনো অন্ধকার ঘরে কেরোসিনের আলোয়।
আর আমি বিশ্বাস করি, এই পৃথিবীতে শেষ পর্যন্ত তাদের জন্যই একটু জায়গা হয়ে ওঠে, যারা হার মানতে শেখেনি। কারণ কিছু মানুষের জীবন জয় দিয়ে লেখা হয় না। লেখা হয় লড়াই দিয়ে। আর সেই লড়াইই একদিন ইতিহাস হয়ে যায়।
No comments:
Post a Comment